হেফাজতে ইসলামের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের কি চিন্তিত হওয়া উচিত?

নতুন মোড়কে হেফাজত কামাল আহমেদ November 26, 2020

হেফাজতে ইসলামের নতুন নেতৃত্বের পরিচয় শেষ পর্যন্ত কোনো চমক দেয়নি। প্রয়াত আল্লামা শফী ও তার ছেলের নিচে থাকা দুই নেতাকে নেতৃত্বের শীর্ষে তুলে আনা হয়েছে। মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী, যিনি হেফাজতের মহাসচিব ছিলেন, তাকে সংগঠনের আমির করা হয়ছে এবং নায়েবে আমির মাওলানা নূর হোসেন কাসেমীকে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব পদে উন্নীত করা হয়েছে।

১৫ সদস্যের শুরা কাউন্সিলে এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ঘোষণা করা হয়; কাউন্সিলটির আয়োজন করা হয় কওমি আন্দোলনের কেন্দ্র আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মইনুল ইসলাম মাদ্রাসায় যা হাটহাজারী মাদ্রাসা নামে বেশি পরিচিত। প্রয়াত আল্লামা শফি হাটহাজারী মাদ্রাসার দেখভাল করতেন; এখনও এটি দেশের হাজার হাজার অনিয়ন্ত্রিত কওমি মাদ্রাসার প্রতিনিধিত্ব করে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে দুই পক্ষের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আল্লামা শফী হাটহাজারী মাদ্রাসার ওপর থেকে তার নিয়ন্ত্রণ হারান। এর পর তার ছোট ছেলে মাওলানা আনাস মাদানি এবং তার সহযোগীদের মাদ্রাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো হেফাজতের নতুন নেতৃত্ব এবং আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যে সম্পর্কের ধরণ।

প্রথমে দেখায় মনে হবে, তারা সরকারের জন্য ভালো কিছু হবে না। মাওলানা বাবুনগরী সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত এবং ইসলামি রক্ষণশীল এজেন্ডা বাস্তবায়নে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আর মাওলানা নূর হোসেন কাসেমী জামিয়তে উলামায়ে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, যেটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অংশ — যদিও হেফাজতের নতুন পদ নেবার পর তিনি আগের পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।

বাবুনগরী ও কাসেমী দু’জনই প্রয়াত আল্লামা শফীর কিছু নীতি ও কাজের বিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, এর মধ্যে বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য হলো ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোটকে সমর্থন দেওয়া। কওমিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির সমান মর্যাদা দেওয়ার সরকারের সিদ্ধান্তের সমর্থনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত গণসংবর্ধনা থেকে দূরে ছিলেন উভয়ই, যেখানে শেখ হাসিনাকে “কওমি মাতা”র উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

ধারণা করা হয়, এই দুজনই সরকারের কাছ থেকে দূরে রাখতে সংগঠনের গতিপথ নির্ধারণে তাদের নেতৃত্বকে ব্যবহার করেছেন; বিশেষত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং যেসব নীতিকে তারা ইসলামের রক্ষণশীল ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় মনে করে সেগুলোর ক্ষেত্রে; তবে সেটা ভুলও হতে পারে।

যাহোক, ফ্রান্সবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে বাবুনগরীর মন্তব্যগুলো দেখে মনে হয়েছে ঘটনা আসলে তা নাও হতে পারে। সেখানে তিনি বলেছেন, সরকার আরও ১০০ বছর ক্ষমতায় থাকুক, কিন্তু ইসলামকে রক্ষা করতে হবে। এ বক্তব্যে তার অনুসারী এবং পর্যবেক্ষকদের ভ্রু কুঁচকে গিয়েছিল। কারণ এটি তার আগের অবস্থানের বিপরীত। চারদিকে সন্দেহ যে, ৫ মে ২০১৩ সালের রক্তাক্ত ঘটনার পবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আল্লামা শফীর সঙ্গে সরকার যেমন বোঝাপড়া করেছিল ঠিক তেমন কোনো বোঝাপড়া হয়েছে তার সঙ্গে।

পর্দার পেছনে সমঝোতা হওয়া নিশ্চয়ই সম্ভব। প্রথম সারির বাংলা সংবাদপত্র, প্রথম আলো, তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, সাবেক মন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ শুরা কাউন্সিলের বৈঠকের আগে বাবুনগীরর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং নতুন কমিটি নিয়ে আলোচনা করেছেন। কাজেই সমঝোতার অনুমান নাকচ করে দেওয়া যায় না, কারণ সরকারের পক্ষ নিয়ে এ ধরনের সমঝোতা করার খ্যাতি আছে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের। আওয়ামী লীগের স্থানীয় এমপিও বাবুনগরী ও কাসেমীর প্রতি তার সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

সংবাদমাধ্যমে এসেছে, শুরার সময় মাদ্রাসার চারপাশে পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। তা দেখে ধারণা করা যায়, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন বাড়তি পদক্ষেপ নিয়েছিল। কাউন্সিলকে এভাবে সুবিধা দেওয়া সম্ভবত কিছু প্রশাসনিক আশীর্বাদের ইঙ্গিত দেয়।

এটিও একটি লক্ষণ যে, হেফাজতের মধ্যে থাকা শফিপন্থীরা জামায়াতবিরোধী বক্তব্য ব্যবহার করেও ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। শুরা কাউন্সিলের আগে, বাবুনগরীর দুজন সাবেক সহযোগী, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মহিবুল্লাহ এবং মইনুদ্দিন রুহি ঢাকা ও চট্টগ্রামে পৃথক দুটি সংবাদ সম্মেলন করেন, সেখানে তারা দাবি করেন, জামায়াত-ই-ইসলাম হেফাজতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে।

চট্টগ্রামে আল্লামা শফীর শ্যালক মইনুদ্দিন এমন অভিযোগও করেন যে, জামায়াত ও তার ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবির শফীকে হত্যা করেছে। চট্টগ্রামের সংবাদ সম্মেলনে শফীর এক নাতিও উপস্থিত ছিলেন, তিনি অভিযোগ করেন, আল্লামার কনিষ্ঠ পুত্র মাওলানা আনাস মাদানীর প্রাণনাশের হুমকির কারণে উপস্থিত হতে পারেননি।

চট্টগ্রামের সংবাদ সম্মেলনের আয়োজকরা এ বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানান। এটি স্পষ্টভাবে সরকারের ওপর কোনও প্রভাব ফেলেনি — সম্ভবত তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে হেফাজতের ক্ষমতার ভরকেন্দ্র বদলে গেছে এবং তাদের সে বাস্তবতা মেনে নেওয়া দরকার; অথবা তাদের মনে হয়েছে, চরম খারাপ সাংগঠনিক অবস্থার কারণে বিএনপির সঙ্গে হেফাজতের পুনরেকত্রীকরণের ঝুঁকি এখন উবে গেছে।

মনে হচ্ছে, সরকার ইসলামপন্থী গ্রুপগুলোকে সর্বাধিক স্বাধীনতা দেওয়ার নীতি অব্যাহত রাখবে, তারা তাদের ক্ষমতার ক্ষেত্রে কোনও হুমকি সৃষ্টি করছে না বলে মনে করছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধী ও ভিন্নমতের ক্ষেত্রে সহনশীলতা দেখাবে ন্যূনতম মাত্রায়।

ইসলামপন্থী দলগুলোকে সন্তুষ্ট করার এই নীতি অবশ্য সরকার সমর্থকসহ অনেককেই উদ্বিগ্ন করেছে। তাদের যুক্তি, সরকারের এই ছাড়গুলো ইসলামপন্থীদের শক্তিশালী করছে এবং এর ফলশ্রুতিতে তাদের দাবি ও চাপ বেড়েই চলছে যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক মোড় নিতে পারে। বাংলাদেশে সত্যিকারের বিরোধী দলের অনুপস্থিতি অব্যাহত থাকায় এটা খুবই সম্ভব যে, ভবিষ্যতে এই ইসলামপন্থী নেতারা আবার রাজনৈতিকভাবে উচ্চাভিলাষী হয়ে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক বিকল্প হয়ে উঠতে চাইতে পারে। আর যদি তা ঘটে, তবে সত্যিকারের সেই দুর্যোগের জন্য আওয়ামী লীগই দায়ী হবে।●

কামাল আহমেদ, সাংবাদিক।

* ইংরেজি থেকে অনুবাদিত।