হ্যাকিং ও অন্যান্য সাইবার অপরাধে জড়িত বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর; “আমাদের ছেলেমেয়েরা [ফেসবুক হ্যাক করে]”, বলছেন মোস্তফা জব্বার।

সরকারি হ্যাকিং: “আমরা ফেসবুক হ্যাক করি” নেত্র নিউজ May 30, 2020

বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ভিন্নমতালম্বী ও বিরোধী সংগঠনগুলোর ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইল হ্যাক করার অভিযোগ উঠেছে, যা দেশটির সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক আইনের সম্ভাব্য লঙ্ঘন। আরেক ঘটনায় একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি মন্ত্রী এক টিভি সাংবাদিকের কাছে বড়াই করে বলছেন, সরকার ও আইন শৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থার হয়ে রাজনৈতিক ভিন্নমতালম্বী মানুষজনের ফেসবুক প্রোফাইল নজরদারি ও হ্যাক করে থাকেন হ্যাকাররা।

বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই)-এর হয়ে হ্যাকার ও অনলাইন ট্রল হিসেবে কাজ করেন এমন বেশ কয়েকজন হুইসেলব্লোয়ার নেত্র নিউজের সাথে যোগাযোগ করেছেন। তারা ডিজিএফআইয়ের হ্যাকিং ও অনলাইন ট্রলিং কার্যক্রমের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। তাদের দেওয়া নথিপত্র-ভিত্তিক প্রমাণ থেকে দেখা যায়, গোয়েন্দা সংস্থাটির দুইটি বিশেষ ইউনিট — সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (এসআইবি) ও পাবলিক রিলেশন্স মনিটরিং সেল (পিআরএমসি) — হ্যাকিং ও বিভিন্ন ধরণের সাইবার অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত। এসব অপরাধ কার্যক্রমের লক্ষ্যবস্তু হলেন সাংবাদিক, রাজনৈতিক ভিন্নমতালম্বী, বিরোধী গোষ্ঠী ও ছাত্র সংগঠকরা। উভয় ইউনিটই বেসামরিক চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের মাধ্যমে “আক্রমণাত্মক সাইবার কার্যক্রম” পরিচালনা করে। এসব কর্মীরা সরাসরি পদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে জবাবদিহি করেন।

“আক্রমণাত্মক সাইবার কার্যক্রম”

নেত্র নিউজের একজন সম্পাদককে হুইসেলব্লোয়ারদের একজন বলেন, “আমরা ফেসবুক হ্যাক করি আর [ অন্যান্য সাইবার অপরাধ করি]। [ডিজিএফআই কর্মকর্তারা] টার্গেট সেট করে দেন, আমরা তখন ব্যবস্থা নেই। তবে ঝামেলার কাজগুলো অন্য একটা টিমকে দেওয়া হয়, ওদের কাছে সফিস্টিকেটেড টেকনোলজি আছে।”

ঠিক এই দাবিরই সত্যতা মিলেছে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বারের সাম্প্রতিক এক টিভি সাক্ষাৎকারে। ফেসবুকে সরকারের সমালোচনাকারী সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিরোধীদের (যাদেরকে “ষড়যন্ত্রকারী” ও “গুজব প্রচারকারী” হিসেবে বর্ণনা করা হয়) বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তাই ছিল ৩ এপ্রিল সময় নিউজে সরাসরি সম্প্রচারিত ওই সাক্ষাৎকারের বিষয়বস্তু।

মন্ত্রী জব্বার ওই সাক্ষাৎকারে সময় নিউজের প্রতিবেদককে বলেন, “[ফেসবুক] তথাকথিত মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং অন্যান্য অজুহাতগুলো দাঁড় করায় যেগুলোর ক্ষেত্রে আমাদেরকে কিছুটা অসুবিধা ফেস করতে হয়। তবে আমরা এটাও বলে রাখি যে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ যেমনি করে কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আমাদের ছেলেমেয়েরা কিন্তু এই কর্তৃপক্ষ ছাড়াও কোথায় কে কি করছে সেটি আইডেন্টিফাই করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতন, তাদের আইডি হ্যাক করার মতন অথবা বন্ধ করার মতন ব্যবস্থা নিতেও আমরা সক্ষম হয়েছি। এটি সুখের বিষয়, আমি বলবো।”

তিনি আরও বলেন, “দেশবাসী আশ্বস্ত হতে পারেন যে আমাদের এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ আমরা যে টিমটা এখন কাজ করছি সেই টিমটা অত্যন্ত সতর্ক, অত্যন্ত সক্ষম, প্রযুক্তিসম্পন্ন এবং সেই কারণেই কারো পক্ষে পার পেয়ে যাওয়াটা সম্ভব হবে না।”

সাক্ষাৎকার চলাকালে বিদেশে নির্বাসিত দুই ভিন্নমতালম্বী ও একজন সাংবাদিকের ফেসবুক প্রোফাইলের স্ক্রিনশট প্রদর্শন করে সময় নিউজ। এরা হলেন পিনাকি ভট্টাচার্য (লেখক, ফ্রান্সে নির্বাসিত), মীর জাহান (সাবেক ডিজিএফআই কর্মকর্তা, ফ্রান্সে নির্বাসিত) ও সুইডিশ-বাংলাদেশি সাংবাদিক তাসনিম খলিল (নেত্র নিউজের এডিটর-ইন-চিফ)।

পিনাকি ভট্টাচার্য নেত্র নিউজকে জানান, তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট মোট তিন বার হ্যাক করা হয়। একবার ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, আরেকবার ৩০ মার্চ ২০২০। মন্ত্রী জব্বারের ওই সাক্ষাৎকার প্রচারের একদিন আগে অর্থাৎ ২ এপ্রিল ২০২০ তারিখে তৃতীয়বার পিনাকি ভট্টাচার্যের ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়। মীর জাহান জানান তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট সাম্প্রতিক সময়ে হ্যাক হয়নি।

তাসনিম খলিলের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইল সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোনোভাবে হ্যাক হয়েছে বা ঝুঁকিতে পড়েছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। তবে নেত্র নিউজের সাথে যেসব হুইসেলব্লোয়াররা যোগাযোগ করেছেন, তারা বলছেন ডিজিএফআইয়ের সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রীক শিক্ষার্থীদের সংগঠন স্বতন্ত্র জোটের ফেসবুক পেজ হ্যাক করে, যেন জোটের নেতা ওই পেজ ব্যবহার করে তাসনিম খলিলের সাথে ফেসবুক লাইভ সেশন আয়োজন করতে না পারেন।

“মেয়েটাতো বিপদে পড়বে”

স্বতন্ত্র জোট তাদের নেতা অরণি সেমন্তি খানের সাথে একটি আলোচনায় অংশ নিতে নেত্র নিউজের এডিটর-ইন-চিফ তাসনিম খলিলকে আমন্ত্রণ জানায় । ওই আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল দেশে কভিড-১৯ মহামারি ও এই সম্পর্কিত খবরাখবর প্রকাশের ওপর সেন্সরশিপ। ১৩ মে সংগঠনটির ফেসবুক পেজে ওই আলোচনা সরাসরি সম্প্রচার হওয়ার কথা ছিল।

ফেসবুক লাইভে আলোচনা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে তাসনিম খলিলকে একজন ইনসাইডার জানিয়ে দেন যে, ডিজিএফআইয়ের পাবলিক রিলেশন্স মনিটরিং সেল (পিআরএমসি) ওই আলোচনা ভণ্ডুল করার পরিকল্পনা করছে।

তাসনিম খলিলকে লেখা বার্তায় ওই ব্যক্তি অনুষ্ঠেয় আলোচনায় অংশগ্রহণের ঘোষণা সম্বলিত সেমন্তি খানের একটি ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট দিয়ে মন্তব্য করেন, “মেয়েটাতো বিপদে পড়বে।” নেত্র নিউজের এডিটর-ইন-চিফকে আরও বলা হয় যে, ডিজিএফআই তাকে “পারসনা নন গ্রাটা” (বা অনাকাঙ্খিত ব্যক্তি) হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশে যিনিই তার সাথে ফেসবুক লাইভে আলোচনা আয়োজন করতে চাইবেন, তিনিই বিভিন্ন ধরণের জবরদস্তীমূলক ব্যবস্থার শিকার হবেন।

পিআরএমসির ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমে স্বতন্ত্র জোটের ফেসবুক পেজ গণহারে ভুয়া রিপোর্টের মাধ্যমে “উড়িয়ে দেওয়ার” নির্দেশ দেওয়া হয় হ্যাকার ও ট্রলবাহিনীকে। নেত্র নিউজকে দেওয়া এ সংক্রান্ত এক অডিও ক্লিপে, এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, “সবাইকে [ফেসবুকে] রিপোর্ট মারতে হবে। যতো ক্যাটাগরি আছে — ফেক, ভায়োলেন্স — সব আজকে এপলাই হবে। এইটা উড়াইতে হবে।”

 পিআরএমসির ট্রল বাহিনীর গণ-রিপোর্টের পর ফেসবুক স্বতন্ত্র জোটের পেজে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। ফেসবুক থেকে পেজের অ্যাডমিনদের একটি সার্ভিস নোটিশ দিয়ে জানানো হয়, “[পেজ] সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। আপনার পেজ থেকে পোস্ট করা স্টোরি আর নিউজফিডে দেখানো হচ্ছে না।”

এছাড়াও, শত শত ভুয়া বট অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন আক্রমণাত্মক, নেতিবাচক ও অশ্লীল মন্তব্য দিয়েও ভরিয়ে দেওয়া হয় ওই পেজ।

হুইসেলব্লোয়াররা বলছেন, পিআরএমসির ট্রলবাহিনীর জন্য এটি নিত্যনৈমিত্তিক একটি কাজ। বেসামরিক চুক্তিভিত্তিক ঠিকাদারি কিছু প্রতিষ্ঠান ফেসবুকে হাজার হাজার ভুয়া পেজ ও অ্যাকাউন্ট তৈরি করে রেখেছে। তাদেরকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পোস্ট, পেজ ও প্রোফাইলের লিঙ্ক সহ টার্গেটের তালিকা সম্বলিত একটি ডকুমেন্ট পাঠানো হয়। এগুলোর বেশিরভাগই হয় সমালোচক সাংবাদিক, রাজনৈতিক ভিন্নমতালম্বী ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের।

হুইসেলব্লোয়ারদের একজন বলেন, “বিভিন্ন টিমের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেওয়া আছে। এই টিম করে কপিরাইট, এই টিম করে ভায়োলেন্স, এই টিম করে কমেন্ট, এই টিম করে অ্যাকাউন্ট ডিজেবল।”

তবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অতিগুরুত্বপূর্ণ টার্গেটদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বা পেজ হ্যাক করার কাজ পিআরএমসি ও তাদের ট্রল বাহিনীর আওতার বাইরে। সেসব কাজ করে থাকে হ্যাকারদের একটি বিশেষ দল, যারা বেসামরিক ঠিকাদার হিসেবে সিগন্যাল ইন্টিলিজেন্স ব্যুরো (এসআইবি)-এর অধীনস্থ। এই হ্যাকাররা ঢাকা সেনানিবাসে ডিজিএফআই সদর দপ্তরে বসেই কাজ করেন।

নেত্র নিউজকে এমন প্রমাণও দেওয়া হয়েছে যে, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে পিনাকি ভট্টাচার্যের অ্যাকাউন্ট হ্যাকের নেপথ্যে ছিল এসআইবি। তখন তিনি বাংলাদেশেই অবস্থান করছিলেন। ঠিক একইভাবে ২০২০ সালের মে-তে স্বতন্ত্র জোটের পেজও হ্যাক করেছে এসআইবি।

“যতো ভট্টাচার্য আছে সব বের করো”

হুইসেলব্লোয়াররা বলছেন, লেখক পিনাকি ভট্টাচার্যকে দীর্ঘদিন ধরেই অতিগুরুত্বপূর্ণ টার্গেট হিসেবে বিবেচনা করে ডিজিএফআই। তিনি প্রায়ই শ্লেষাত্মক ভাষায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করেন। অল্প যে কয়েকজন ব্যক্তি যাদের ফেসবুক প্রোফাইল “২৪/৭ ৩৬৫ দিন” নজরদারিতে রাখে পিআরএমসি তিনি তাদের একজন। সংস্থাটি তাদের আয়ত্তে থাকা সব ধরণের কৌশল ব্যবহার করে তাকে চুপ করাতে চেয়েছিল। তাকে কয়েক মাস ধরে সরাসরি নজরদারিতে রাখা হয়। এরপর ডিজিএফআই সদরদপ্তরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। পরে তিনি গত বছর ফ্রান্সে নির্বাসনে চলে যান।

নেত্র নিউজের হাতে একটি ক্লিপ এসেছে, যেখানে এক ব্যক্তি বড়াই করে বলছেন এসআইবির হ্যাকারদের হাতে কী ধরণের প্রযুক্তি রয়েছে। তিনি বলেন: “পিনাকি ভট্টাচার্যের কেসটা। স্যাররা [ডিজিএফআই কর্মকর্তারা] সবকিছু ট্রাই করছেন। র‍্যাবও ট্রাই করছে। ফেসবুকের সাথেও কন্টাক্ট করা হইছে যে এইখানে  ন্যাশনাল সিকিউরিটি গ্রাউন্ড আছে। কিন্তু ফেসবুক বলছে যে এইখানে  ন্যাশনাল সিকিউরিটি গ্রাউন্ড নাই। তারা পার্সোনাল ডিটেইলস দিবে না। তখন উনারা [ডিজিএফআই কর্মকর্তারা] বললো যে লাগলে ন্যাশনাল আইডির ডাটাবেজ থেকে যতো ভট্টাচার্য আছে সব বের করো। আমাদের [কোনো টার্গেটের ব্যক্তিগত তথ্যবৃত্তান্ত] লাগলে, আমরা [ওই ধরণের ডাটাবেজেও] হাত দিতে পারি।”

এসআইবির হ্যাকাররা অবশেষে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে পিনাকি ভট্টাচার্যের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হয়। তার মোবাইল ফোন নম্বরে পাঠানো টু-ফ্যাক্টর ভেরিফিকেশন কোড হাতিয়ে নিয়েই ওই অ্যাকাউন্ট দখলে নেওয়া হয়।

হুইসেলব্লোয়াররা নেত্র নিউজকে বলেছেন যে, এসআইবির ওই  “এলিট টিমের” কাছেই কেবল ওই ধরণের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার আছে। এতে করে ফেসবুক ও হোয়্যাটসঅ্যাপের মতো সার্ভিসের ভেরিফিকেশন কোড সম্বলিত এসএমএস কোড তারা পেতে পারে। একজন হুইসেলব্লোয়ার বলেছেন, তিনি নিশ্চিত না হলেও, এমনটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি যে, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)-এর ইন্টারসেপশন অবকাঠামোতে সরাসরি অ্যাকসেস রয়েছে এসআইবির।

জবরদস্তীমূলক পদক্ষেপ

একজন স্বাধীন ফরেনসিক তদন্তকারী নেত্র নিউজকে এই অনুসন্ধানে সহায়তা করেছেন। তার গবেষণার ফলাফল ও হুইসেলব্লোয়ারদের দেওয়া বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, স্বতন্ত্র জোটের ফেসবুক পেজ হ্যাক করা হয় ১৩ মে। এসআইবির হ্যাকাররা পেজের একজন অ্যাডমিনের মোবাইল ফোনে এসএমএস আকারে আসা টু-ফ্যাক্টর ভেরিফিকেশন কোড হাতিয়ে নিয়ে তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হন। ওই পেজে অরণি সেমন্তি খান ও তাসনিম খলিলের মধ্যে অনুষ্ঠেয় ফেসবুক লাইভ আলোচনা ভণ্ডুল করতে পিআরএমসির ট্রল বাহিনী ব্যর্থ হলেই ওই কৌশল অবলম্বন করে এসআইবি।

একজন হুইসেলব্লোয়ার নেত্র নিউজের একজন সম্পাদককে বলেন, এসআইবির হ্যাকারদের কাছে একগুচ্ছ হ্যাকড অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অতিগুরুত্বপূর্ণ অপারেশনেই কেবল এগুলো ব্যবহার করা হয়। এসব অ্যাকাউন্ট ভুয়া নয়, বরং এগুলো বাস্তব মানুষজন নিজ নামে খুলেছিলেন। তবে তাদের পাসওয়ার্ড খুবই সাধারণ হওয়ায়, সেগুলোর নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয় হ্যাকাররা। হ্যাক করার পর ওই অ্যাকাউন্টগুলোর নাম প্রায়ই সুপরিচিত বিরোধী দলীয় নেতাদের নামে পরিবর্তন করে ফেলা হয়। এই নাম পরিবর্তনের কারণ তারা বলতে পারেননি। এসব আইডির একটি সুবিধা হলো, এই সাধারণ মানুষদের অ্যাকাউন্ট পুরোনো হয়ে থাকে আর তাদের বড় বন্ধুতালিকা থাকে, যা নতুন অ্যাকাউন্টের থাকে না। এছাড়া ফেক অ্যাকাউন্ট নিধনে ফেসবুকের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাও পুরোনো আইডিকে ধরতে পারে না।

হুইসেলব্লোয়ারদের একজনের সাথে নেত্র নিউজের একজন সম্পাদকের কথোপকথন।

স্বতন্ত্র জোটের এক সদস্যের দেওয়া টেকনিক্যাল কিছু তথ্যের ভিত্তিতে ওই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ পেজটির নিয়ন্ত্রণ দখলে নেওয়া ও হ্যাকিং প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ দিতে সক্ষম হয়েছেন। তার গবেষণার ফলাফল বলছে, ওই ফেসবুক পেজের একজন অ্যাডমিনের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট প্রথমে নিয়ন্ত্রণে নেয় হ্যাকাররা। এরপর পেজের বাকিসব অ্যাডমিন ও এডিটরদের “অ্যাডভার্টাইজার” বানিয়ে দেওয়া হয়। পেজের “অ্যাডভার্টাইজার”রা বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেন না। এরপর পেজে নতুন একজন অ্যাডমিন ও একজন এডিটর যোগ করা হয়। এই দুই নতুন অ্যাকাউন্টের অন্তত একটি অ্যাকাউন্ট মূলত একজন সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারীর। কয়েক সপ্তাহ আগেই সেই অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়। তবে পরে অ্যাকাউন্টটির নাম পাল্টে এক বিতর্কিত বিএনপি নেতার নামে রাখা হয়।

ওই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের সহায়তায় আমরা ওই অ্যাকাউন্টের মূল মালিককে খুঁজে বের করি কুমিল্লায়। পেশায় ব্যবসায়ী ওই ব্যক্তি নেত্র নিউজের একজন প্রতিবেদককে জানান যে, এপ্রিলের শুরুতে বা মাঝামাঝি হঠাৎ করেই তিনি আর তার অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারছিলেন না। পরে তিনি নতুন একটি অ্যাকাউন্ট খুলে ফেসবুক ব্যবহার করা চালিয়ে যান। তিনি স্বতন্ত্র জোট বা সংগঠনটির কোনো নেতাদের চেনেনও না।

একজন সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারীর প্রোফাইলের নাম পরিবর্তন করে বিএনপির একজন নেতার নাম দেওয়া হয়েছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের সহায়তায় নেত্র নিউজ ওই অ্যাকাউন্টের মূল মালিককে খুঁজে বের করে কুমিল্লায়।

১৪ মে স্বতন্ত্র জোট একটি অনলাইন সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে ওই “সাইবার আক্রমণে”র নিন্দা জানিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। সংগঠনটির একজন নেতা ওই হ্যাকিং-এর ঘটনায় চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানায় একটি সাধারণ ডায়রিও দায়ের করেন।

স্বতন্ত্র জোট তাদের ফেসবুক পেজের নিয়ন্ত্রণ হারালে ১৩ মে রাতে অরণি সেমন্তি খান তার ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে সাংবাদিক তাসনিম খলিলের সাথে ফেসবুক লাইভটি প্রচার করেন।

“হ্যাকিং সংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ড”

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি মন্ত্রী নিজেই সরাসরি সম্প্রচারিত টিভি অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয়-পৃষ্ঠপোষকতায় করা হ্যাকিং নিয়ে বড়াই করলেও এবং দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ভিন্নমতালম্বী, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের সংগঠনকে টার্গেট করে সাইবার আক্রমণ চালালেও, বাংলাদেশের বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইনে হ্যাকিং একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ নামে ওই আইনের সমর্থকরা প্রায়ই একে “হ্যাকিং বিরোধী আইন” হিসেবে উপস্থাপন করেন।

ওই আইনের ৩৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে: “যদি কোনো ব্যক্তি হ্যাকিং করেন, তাহা হইলে উহা হইবে একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ১৪ (চৌদ্দ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১ (এক) কোটি টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।”

এছাড়া “অনুমতি ব্যতীত পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ, ব্যবহার”; “পরিচয় প্রতারণা বা ছদ্মবেশ ধারণ”; “আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ”, ইত্যাদি সাইবার অপরাধের জন্যও নির্দিষ্ট সাজার কথা বলা আছে ওই আইনে।

এই বিষয়ে একজন আইনজ্ঞ নেত্র নিউজকে জানান, আইনে সরকারি কর্মকর্তা ও সরকারের হয়ে কাজ করা ঠিকাদাররা হ্যাকিং বা অন্যান্য সাইবার অপরাধে জড়ালে দায়মুক্তি পাবেন বা ছাড় পাবেন এমনটি বলা নেই।

“আমি এ ধরণের কোনো রিপোর্টারের সাথে কথা বলিনি”

নেত্র নিউজের পক্ষ থেকে যখন মন্ত্রী মোস্তফা জব্বারের মন্তব্য নিতে যোগাযোগ করা হয়, তিনি প্রথমে নেত্র নিউজের এডিটর-ইন-চিফ তাসনিম খলিলের সাথে কথা বলতে সম্মত হন। রেকর্ড করা টেলিফোন আলাপচারিতায় মন্ত্রীকে সময় নিউজের ওই সাক্ষাৎকার ও সেখানে মানুষের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার যেই দাবি তিনি করেছিলেন, সেই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন তাসনিম খলিল। জব্বার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি অস্বীকার করেন।

মোস্তফা জব্বার: কিসের? সরকারের পক্ষের লোকজন আইডি হ্যাক করছে?

তাসনিম খলিল: হ্যাঁ, আমি আপনাকে পড়ে শোনাই আপনার এক্সাক্ট কোটেশনটা। আপনি যেটা বলছেন রিপোর্টার শুভ খানকে, সেটা হলো…

মোস্তফা জব্বার: আমি এরকম কোনো রিপোর্টারের সাথে কথাই বলি নাই।

তাসনিম খলিল: সময় নিউজের কোনো রিপোর্টারের সাথে আপনি কি কথাই বলেন নাই? আপনার বাসা থেকে সরাসরি… 

মোস্তফা জব্বার: কোনো কথাই বলিনি।

তাসনিম খলিল: আচ্ছা… আমাদের কাছে কিন্তু ভিডিও ক্লিপ আছে। এই যে ইন্টার্ভিউটি তারা ব্রডকাস্ট করেছে, যেখানে আপনি বলেছেন যে, “আমাদের ছেলেমেয়েরা কিন্তু এই কর্তৃপক্ষ ছাড়াও কোথায় কে কি করছে সেটি আইডেন্টিফাই করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতন, তাদের আইডি হ্যাক করার মতন অথবা বন্ধ করার মতন ব্যবস্থা নিতেও আমরা সক্ষম হয়েছি।” এই…

মোস্তফা জব্বার: এসব বিষয় (অস্পষ্ট) সময় নিউজের ইন্টারভিউ সময় নিউজে থাকবে। আপনার সাথে কথা বলার ইচ্ছা আমার নেই।

এরপর কিছুক্ষণ অস্পষ্ট বাদানুবাদের পর মোস্তফা জব্বার ফোন কেটে দেন।

ফেসবুকের প্রতিক্রিয়া

নেত্র নিউজ এই বিষয়ে ফেসবুকের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ফেসবুকের একজন মুখপাত্র বলেন: “আমরা আমাদের সেবার বিশুদ্ধতা (integrity) অক্ষুণ্ণ ও নিরাপদ রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমাদের ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে অনুনোমদিতভাবে প্রবেশের যেকোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে আমরা পদক্ষেপ নিয়ে থাকি। [স্বতন্ত্র জোটের পেজ] নিরাপদ করতে আমরা কাজ করছি। আমরা অ্যাপ-ভিত্তিক টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ও অচেনা লগইন-এর বিষয়ে সতর্কতা চালু করে অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে মানুষকে উৎসাহিত করছি।”

“আমার নলেজে নাই”

ডিজিএফআইয়ের এসআইবি ও পিআরএমসি বিভাগের দুই প্রধানের (উভয়েই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) বক্তব্য নিতে তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় নেত্র নিউজ। এই প্রতিবেদনের বিষয়ে ডিজিএফআইয়ের কার সাথে যোগাযোগ করা যায়, তা জানতে সংস্থাটির সদরদপ্তরে ফোন করা হলে একজন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি “[তার] নলেজে নাই।”

স্বতন্ত্র জোটের অরণি সেমন্তি খান কোনো মন্তব্য করতে চাননি।●