“অপরাধ ও দুর্নীতির কাছে জিম্মি রাষ্ট্রের অবস্থা” তুলে ধরায় “অল দ্যা প্রাইম মিনিস্টার’স মেন” প্রতিবেদনের ভূয়সী প্রশংসা বিচারকমণ্ডলীর

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় পুরস্কৃত “অল দা প্রাইম মিনিস্টারস মেন” নেত্র নিউজ October 19, 2021

আল জাজিরার ইনভেস্টিগেটিভ ইউনিটের তৈরি “অল দ্যা প্রাইম মিনিস্টার’স মেনশ্রেষ্ঠ তথ্যচিত্র হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ ডিআইজি পুরস্কার জিতেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত “অল দ্যা প্রাইম মিনিস্টার’স মেন” দীর্ঘ অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র বিভাগে এ পুরষ্কার পেল। তথ্যচিত্রটিতে বাংলাদেশের উচ্চতম রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মারাত্মক দুর্নীতির বিস্তারিত চিত্র উন্মোচিত হয়।

গত সপ্তাহে দেয়া এই পুরস্কারে ডিআইজি বিচারকেরা বলেন, এখানে অবিশ্বাস্য দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। এই তথ্যচিত্র দর্শককে একদম ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়, যেখানে ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহারগুলো ঘটেছে। সংগঠিত অপরাধ সম্পর্কে গোপন তথ্য ফাঁসকারী সাহসী এক ব্যক্তির সুবাদে এবং তথ্যচিত্র নির্মাতা দলের সুদক্ষ অনুসন্ধানে অপরাধে জড়িত রাঘব-বোয়ালদের খোঁজ বেরিয়ে আসে। আমরা দেখতে পাই, রাষ্ট্রটি কিভাবে সুসংগঠিত অপরাধ ও দুর্নীতিতে ডুবে গেছে। এই অনন্যসাধারণ অনুসন্ধান বাংলাদেশে তীব্র আলোড়ন তৈরি করে এবং সর্বোচ্চ স্তরের ক্ষ্মতাশালীদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করে।

ডিআইজি আরও মন্তব্য করে, এই তথ্যচিত্রে দেখান হয়েছে কীভাবে সংগঠিত অপরাধ পরিচালনাকারী একটি পরিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত থেকে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সঙ্গে আঁতাত করে পুরো রাষ্ট্রকে কবজা করে রেখেছে।  

বিশ্বের নামকরা সব সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা করে পুরস্কার জিতেছে আল জাজিরার এই তথ্যচিত্র। প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া অন্যান্য তথ্যচিত্রের মধ্যে ছিল বিবিসি নির্মিত “দ্য বেইবি স্টিলার”। পুরস্কার দেয়া হয় গত ৩ অক্টোবর।

মূল তথ্যচিত্র ছাড়াও এর নির্মাণ প্রক্রিয়া ও ভেতরের গল্প নিয়ে যে পডকাস্ট প্রকাশিত হয়েছিল, সেটিও পুরস্কৃত হয়। পডকাস্ট সম্পর্কে বলা হয়, “অনুসন্ধান কাজের বিভিন্ন আকর্ষণীয় দিক, ঘটনার গভীরে যাবার সাহসিকতা, পটভূমি বর্ণনার যে সুউচ্চ মান এবং এর চমৎকার শব্দ ধারণ ও সম্পাদনা — তা [পডকাস্টে] উঠে এসেছে”।  

পুরস্কার প্রদানকারী সংগঠন ডিআইজির নামের পূর্ণাঙ্গ রূপ “দকুমেনতারি, ইনচ্যাইস্তে, জোরনালিজমি” (তথ্যচিত্র, অনুসন্ধান, সাংবাদিকতা)। ডিআইজি ২০১৫ সাল থেকে একটি পদক প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে। সংস্থাটি উঁচু মানের অনুসন্ধান ও প্রতিবেদন তৈরিতে নিযুক্ত সাংবাদিকদের দক্ষতা বিচারের একটি মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি বিবৃতিতে আল জাজিরার ইনভেস্টিগেটিভ ইউনিট (এজেআই) জানায়, “অল দ্যা প্রাইম মিনিস্টার’স মেন” এই পুরস্কার পাওয়ায় তারা অত্যন্ত আনন্দিত। তথ্যচিত্র নির্মাতারা উল্লেখ করেন, এই পুরস্কারের মধ্যদিয়ে আন্তর্জাতিক বিচারকমণ্ডলী বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে, যেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা চরমভাবে সীমিত এবং মানবাধিকার ভায়াবহ অবস্থায় আছে, সেখানে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করার গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবে এজেআই [অপরাধের] তথ্য ফাঁসকারী ব্যক্তিদের সাহসিকতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চায়; কারণ তারা এই অনুসন্ধানে অনেক বেশি অবদান রেখেছেন।

আল জাজিরা ইনভেস্টিগেটিভ ইউনিট নির্মিত তথ্যচিত্রে বাংলাদেশ সরকারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মানুষদের মারাত্মক দুর্নীতির চিত্র ফাঁস হয়েছিল। এতে জড়িত ছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং খুনের দায়ে দণ্ডিত তার দুই পলাতক ভাই। অনুসন্ধানে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উচ্চ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদেরও সংশ্লিষ্ট থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।

গত ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ প্রচারিত এই তথ্যচিত্রে দেখা যায়, সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ কিভাবে তার এক ভাই, হারিস আহমেদকে খুনের সাজা থেকে বাঁচিয়ে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। একাজের জন্য জেনারেল আজিজ তার ভাইকে মিথ্যা তথ্য সত্যায়িত করিয়ে, রাষ্ট্রীয় কাগজপত্র এবং মিথ্যা পরিচয়ে নতুন পরিচপত্র বানিয়ে দেন। সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের ভাইয়ের যেসব ভুয়া কাগজপত্র সত্যায়িত করা হয়, তার মধ্যে ছিল মিথ্যা জন্ম, শিক্ষা ও বিবাহ সনদ। এসব সত্যায়িত কাগজপত্র ব্যবহার করে তার ভাই “মোহাম্মদ হাসান” নামে একটি পাসপোর্ট তৈরি করেন। পরে সেটি ব্যবহার করে তিনি বিদেশে চলে যেতে সক্ষম হন এবং এই মিথ্যা পরিচয়েই তিনি হাঙ্গেরি ও ফ্রান্সে নিজের বিশাল ব্যবসা গড়ে তুলেন।  

আল জাজিরা ইনভেস্টিগেটিভ ইউনিটের গোপনে করা  ভিডিওতে হারিস আহমেদের বিভিন্ন অবৈধ আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ দেখা যায়। এসব আর্থিক সুবিধা অর্জনের জন্য তিনি তার সেনাপ্রধান ভাইয়ের পরিচয় ও প্রভাব পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগান। এই প্রভাব কাজে লাগিয়েই হারিস সেনাবাহিনীর ঠিকাদারি জোগাড় করেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে মধ্যস্বত্বভোগী হবার চেষ্টা করেন। তথ্যচিত্রে আল জাজিরা আজিজ আহমেদের পরিবারকে “ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধ-চালনাকারী পরিবার” হিসেবে উল্লেখ করে। তথ্যচিত্রে একজন মন্তব্যকারী এই পরিবারকে “সংগঠিত অপরাধী চক্র” হিসেবে চিহ্নিত করেন।

তথ্যচিত্রে গোপনে করা ভিডিওতে হারিস নিজেই স্বীকার করেছেন যে পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দেশের সবচেয়ে সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে তিনি ঘুষ নিয়েছেন। তথ্যচিত্রে হারিসকে বলতে শোনা যায়,  “ট্রান্সফারের টাকাটা খায় হইল হোম মিনিস্টার, আইজি, পুলিশ কমিশনার, এই তিনজন”। হারিস বলতে থাকেন, “মনে করেন ৫ কোটি টাকার কনট্রাক্ট করলেন, ৩ কোটি দিয়া ২ কোটি টাকা আমার। বুঝছেন? এই হইল কাহিনী।”

এছাড়া র‍্যাবকে ইচ্ছামাফিক নিজের কাজে ব্যবহারের কথাও বলতে শোনা যায় হারিসকে: “আমার গুন্ডা অইলো অহন র‍্যাব। আমার আর গুন্ডা লাগে না, আমার তো এইডিই গুন্ডা। কাউরে উডাই লইয়া আও, কাউরে ধরো…ওরাও খায়, আমিও খাই। ডাইরেক্ট কথা!” র‍্যাবকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী সেলিম প্রধানের মোবাইল ফোন ট্র্যাক করেছেন এবং তাকে গ্রেপ্তার করিয়েছেন, তা নিয়েও হারিসকে দম্ভোক্তি করতে শোনা যায় আল জাজিরার এই তথ্যচিত্রে।

তথ্যচিত্রটি প্রচারের পর বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিক্রিয়ায় বলে: “এই প্রতিবেদন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ‘কুৎসা রটনার’ একটি প্রচার অভিযান বলেই প্রতীয়মান। এটি তৈরির পেছনে রয়েছে চরমপন্থী গোষ্ঠী, ও  জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জড়িত একদল কুখ্যাত ব্যক্তি।  [এবং] এখানে মানুষকে বিভ্রান্ত করার কিছু পরোক্ষ ইঙিতপূর্ণ কথা ছাড়া আর কিছুই নেই।”জেনারেল আজিজ আহমেদ গত জুনে সেনাপ্রধান পদ থেকে অবসর নেন। আল জাজিরার তথ্যচিত্র প্রচারের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় যে আজিজ আহমেদের দুই ভাইয়ের খুনের দায়ে পাওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ২০১৯ এর মার্চেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গোপনে মওকুফ করে দিয়েছে।●