সম্প্রতি কিছু শীর্ষ সেনাকর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো আর কয়েকজনকে পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনা থেকে ইঙ্গিত মিলছে যে প্রধানমন্ত্রী কাকে পরবর্তী সেনাপ্রধান হিসেবে বেছে নিতে পারেন।

কে হবেন বাংলাদেশের পরবর্তী সেনাপ্রধান? নেত্র নিউজ June 5, 2021

জেনারেল আজিজ আহমেদ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসএম শফিউদ্দিন আহমেদ।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বর্তমান প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ চলতি মাসেই অবসরে যাবেন। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান শাসন কাঠামোয় অন্যতম ক্ষমতাধর এই পদে জেনারেল আজিজের স্থলাভিষিক্ত কে হবেন, তা নিয়ে বেশ আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে জানতে নেত্র নিউজ বেশ কয়েকজন সামরিক ও রাজনৈতিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলেছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কর্মকর্তার অবসরগ্রহণ ও পদোন্নতির ঘটনা ঘটেছে। এ থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে যে সেনাপ্রধান হওয়ার দৌড়ে কে আছেন, আর কে ছিটকে পড়েছেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পাঁচ লেফটেন্যান্ট জেনারেল থেকে এক জনকে সেনাপ্রধান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। গত বছরের শেষের দিকে এদের চার জনকে অবসরে পাঠানো হয়। এরা হলেন শেখ মামুন খালেদ, যিনি অবসরে যান ২০২০ সালের ৩০ অক্টোবর; মাহফুজুর রহমান, যাকে অবসরে পাঠানো হয় ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর; মোহাম্মদ শামসুল হক, যিনি অবসরে যান ২০২০ সালের ৯ ডিসেম্বর; এবং মোহাম্মদ শফিকুর রহমান, যিনি ২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর অবসরে যান। এদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট জেনারেল শামসুল হক ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল শফিকুর রহমানকে পরবর্তী সেনাপ্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল।

বাংলাদেশের সেনা কর্মকর্তাদের অবসরগ্রহণের বয়সসীমা ৫৮ বছর। সুতরাং, এমনটাও হয়ে থাকতে পারে যে, এই কর্মকর্তারা স্বাভাবিক নিয়মেই অবসরে গেছেন। কিন্তু এদের কাউকে যদি সরকার সেনাপ্রধান বানাতে চাইতো, তাহলে জেনারেল আজিজের অবসরগ্রহণের আগ পর্যন্ত তাদের মেয়াদ চুক্তিভিত্তিক পদ্ধতিতে বাড়ানো যেত। কিন্তু তারা নিজেরাই এখন অবসরে চলে গেছেন। ফলে তারা আর প্রতিযোগিতায় নেই।

শেখ হাসিনার একজন ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী নেত্র নিউজকে জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক অবসরে যাওয়া চার জনের মধ্যে তিন জনের মেয়াদ বৃদ্ধির চেষ্টা করছিলেন। তখনকার ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সূত্রটির মতে, তারিক আহমেদ সিদ্দিক এই তিনজনকেই জানিয়েছিলেন যে, তাদের মধ্যেই একজন পরবর্তী সেনাপ্রধান হবেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাদের মেয়াদ বৃদ্ধিতে সম্মত না হয়ে তার উপদেষ্টাকে প্রচ্ছন্নভাবে তিরস্কারই করলেন; পাশাপাশি এও ইঙ্গিত দিলেন যে পরবর্তী প্রজন্মের কর্মকর্তাদের মধ্যে থেকেই কেউ পরবর্তী সেনাপ্রধান হবেন।

হাসিনার ওই রাজনৈতিক সহযোগী আরও বলেন যে, এই পদের জন্য অপেক্ষাকৃত একজন তরুণ কর্মকর্তাই উপযুক্ত হবেন। তার ভাষ্য, “তিনি হবেন অপেক্ষাকৃত তরুণদের মধ্যে একজন। আর আমি তার সম্পর্কে যতটা জানি, তিনি আইনকানুন ও শৃঙ্খলা মেনে চলতে অভ্যস্ত।”

এদিকে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত যেই পাঁচ জন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তাদের চার জন অবসরে গেলেও, এখনও একজন চাকরিতে বহাল আছেন। তিনি হলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসএম শফিউদ্দিন আহমেদ। তার পদ কোয়ার্টারমাস্টার জেনারেল। এই বছরের ৩০ নভেম্বর তার অবসরে যাওয়ার কথা। তার সমসাময়িক চার লেফটেন্যান্ট জেনারেল যেহেতু অবসরে চলে গেছেন, সুতরাং এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম যে তার মেয়াদ বৃদ্ধি করা হবে।

অবশিষ্ট রইলেন পরবর্তী প্রজন্মের কর্মকর্তারা।

গত বছর অবসরে গেছেন যেসব লেফটেন্যান্ট জেনারেল, তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন নতুন চার জন। মেজর জেনারেল থেকে যেই চার নতুন কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন, তারা হলেন আতাউল হাকিম সারওয়ার হাসান, যিনি এখন চিফ অব জেনারেল স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন; ওয়াকার-উজ-জামান, যিনি এখন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার; আকবর হোসেন, যিনি ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট; এবং এসএম মতিউর রহমান, যিনি আর্মি ট্রেইনিং অ্যান্ড ডক্ট্রিন কম্যান্ডের কম্যান্ডিং অফিসার।

এমন সম্ভাবনা অবশ্যই আছে যে, জেনারেল আজিজ আহমেদকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক (বিশেষ করে, আল জাজিরা’র তথ্যচিত্র “অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স মেন” ঘিরে) থাকলেও, তার মেয়াদ আরও এক বছরের জন্য বৃদ্ধি করে তাকেই সেনাপ্রধান হিসেবে বহাল রাখতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে গুঞ্জন হলো, নতুন চার লেফটেন্যান্ট জেনারেলের মধ্য থেকেই কেউ নতুন সেনাপ্রধান হবেন।

একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা নেত্র নিউজকে বলেছেন যে, জেনারেল আজিজের মেয়াদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তার মতে, “এসব এভাবে হয় না।” তাহলে কার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি জানতে চাইলে তিনি দুই কর্মকর্তার নাম বলেন। তারা হলেন ওয়াকার-উজ-জামান ও এসএম শফিউদ্দিন আহমেদ। তার ভাষ্য, “ওয়াকার স্যার ও সফিউদ্দিন স্যারের মধ্য থেকে কেউ। উভয়েই শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান প্রার্থী।”

কোয়ার্টারমাস্টার জেনারেল সফিউদ্দিন আহমেদ হলেন একমাত্র পুরোনো লেফটেন্যান্ট জেনারেল।

অপরদিকে ওয়াকার-উজ-জামান বর্তমান সেনাবাহিনীর সবচেয়ে তরুণ লেফটেন্যান্ট জেনারেলদের একজন। সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেকেই মনে করেন যে, তিনিই হতে যাচ্ছেন পরবর্তী সেনাপ্রধান। তার আরেকটি পরিচয় হলো, তিনি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব:) মুস্তাফিজুর রহমানের জামাতা।

বিভিন্ন কারণে শেখ হাসিনার দূর সম্পর্কের ফুফা জেনারেল মুস্তাফিজ রাজনৈতিকভাবে আলোচিত ও বিতর্কিত ছিলেন। হাসিনা প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর তাকেই সেনাপ্রধান করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তার আনুগত্য ছিল সুবিদিত। জেনারেল মুস্তাফিজের জামাতা হিসেবে ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। এ বিষয়টি তাকে নিঃসন্দেহে দৌড়ে এগিয়ে রাখবে।

কিন্তু যিনিই শেষ পর্যন্ত সেনাপ্রধান হন না কেন, জেনারেল আজিজের কারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যেই সুনামহানি হয়েছে, তা মেরামতের দায়িত্ব থাকবে তার। পাশাপাশি, দক্ষিণ এশিয়ায় চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন কোয়াডের মধ্যে যেই বিরোধের আলামত দেখা যাচ্ছে, তার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব সামাল দেওয়ার গুরুদায়িত্বও কিছুটা তার উপর বর্তাবে।●