হিন্দুদের উপর আক্রমণের ঘটনা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে না। প্রচলিত আইনেই এ ধরনের অপরাধের বিচার সম্ভব ছিল।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পক্ষে জয়ের সাফাই ডেভিড বার্গম্যান December 9, 2021

  

সম্প্রতি পূজামণ্ডপে হামলার ঘটনার পরদিন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের ফেসবুক পোস্ট।

“ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ছাড়া অনলাইনের মাধ্যমে সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের বিচারের আওতায় আনা কঠিন।” — প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় নিজের ফেসবুক পেজে এ স্ট্যাটাস দিয়েছেন। গত অক্টোবরে কুমিল্লায় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণের পরদিন জয় এ স্ট্যাটাস দেন।

সম্ভবত বিভিন্ন সাংবাদিক, মানবাধিকার সংস্থা এবং বিদেশি সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে সমালোচানা করেছেন, তারই জবাব দিতে জয়ের এই স্ট্যাটাস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের, মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সমালোচনা করায় গত কয়েক বছরে শত শত সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিককে এই আইনের অধীনে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

কিন্তু জয়ের কথা কতখানি সঠিক? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন না থাকলে হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উষ্কানিদাতাদের কি আইনের আওতায় বিচার করা যেত না?

সৌদি থেকে সদ্য ফেরত আসা মোহাম্মদ ফয়েজ নামক এক ব্যক্তি ফেসবুকে একটি লাইভ ভিডিও প্রচারের পরই ওই আক্রমণের ঘটনা ঘটে।

কুমিল্লার নানুয়া দিঘীর পাড় এলাকার একটি পূজা মণ্ডপ থেকে সরাসরি প্রচারিত ওই ফেসবুক ভিডিওতে দেখা যায়, একজন পুলিশ কর্মকর্তা হাতে একটি কোরআন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ভিডিওতে ফয়েজকে বলতে সোনা যায়, ওই পুলিশ কর্মকর্তা “মূর্তির পায়ের নিচ” থেকে কোরআন শরিফটি উদ্ধার করেছেন। কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে  তিনি আরও বলেন, “হায় মুসলমান, তোমরা জেগে উঠো”।

ফেসবুকে ফয়েজের “বন্ধু” সংখ্যা মাত্র ৮৮ হলেও খুব কম সময়ের মধ্যে ভিডিওটি বিপুল সংখ্যায় শেয়ার হয়। মাত্র ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মণ্ডপের সামনে শত শত মানুষ জড়ো হয়। পুলিশ জমায়েত হওয়া জনতাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। আগত লোকজন মণ্ডপে হামলা চালায়।

ওইদিনই কুমিল্লার অন্যান্য স্থানে মিছিল হয় এবং কয়েকটি মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এই সহিংসতা দ্রুত ছড়িয়ে যায়। এসব সহিংসতায় বিভিন্ন মন্দিরে ধ্বংসযজ্ঞ, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের বাড়ি-ঘরে ও ব্যবসায়িক স্থাপনায় ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। কয়েকদিনের সহিংসতায় সাতজন মানুষ মারা যায়। এই সাতজনের মধ্যে অন্তত দুজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। পরে সিসিটিভির ফুটেজ থেকে জানা যায়, কুমিল্লার মণ্ডপে একজন মুসলমান ব্যক্তি ওই কোরআন রেখেছিলেন।

এখন প্রশ্ন হলো, ভিডিও পোস্ট করাটাকে ফয়েজের অপরাধ হিসেবে দেখা কতখানি উচিত হবে।

দেবতার পদতলে পবিত্র কোরআন পাওয়ার দাবি করে যে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়েছে, তার ভাষা স্পষ্টতই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার উষ্কানি দেয়। আর সহিংসতায় উষ্কানি দেওয়া ফৌজদারি আইনে অপরাধ।

দ্বিতীয় বিষয় হলো, সহিংসতায় উষ্কানিদাতা ব্যক্তিকে আইনের আওতায় বিচারের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজন রয়েছে কিনা। 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি ধারা আছে যা কুমিল্লার ঘটনার পেছনে থাকা ভিডিওটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী কেউ যদি এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করে যা “সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম হয়”, তাহলে তাকে বিচারারের আওতায় আনা যায়। এই ধারায় বর্ণিত অপরাধ জামিন অযোগ্য। অর্থাৎ অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতের বিবেচনা সাপেক্ষে জামিন পেতে পারেন। এবং এতে সাত বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয়ের বিধান রয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশের ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির আওতায় ইতিমধ্যেই এমন দুটি অপরাধের উল্লেখ রয়েছে, যে দুটির অধীনে ফেসবুকের সেই ভিডিও প্রচারকারীর বিচার করা যায়। একই সঙ্গে ওই ভিডিও প্রচারে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে,  এতে ওই দণ্ডবিধির প্রয়োগ আরও বেশি যথাযথ হত।

দণ্ডবিধির ৫০৫ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি “কোনো দল বা সম্প্রদায়কে অন্য যেকোনো দল বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়ার উদ্দেশ্যে বা উষ্কানি সৃষ্টির সম্ভাবনা আছে, এমন বক্তব্য, গুজব বা প্রতিবেদন তৈরি, প্রকাশ বা বিতরণ করে” তবে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

দণ্ডবিধির ৫০৫ (ক) তে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি “এমন কোনো বক্তব্য, গুজব বা প্রতিবেদন তৈরি, প্রকাশ বা বিতরণ করে যা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বা করতে পারে”, তবে তা এই ধারার অধীনে অপরাধ বলে গণ্য হবে।

দণ্ডবিধির এই দুই ধারাও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারাটির মতোই অজামিনযোগ্য অপরাধ এবং শাস্তির বিধানও একই রকম।

দণ্ডবিধির ধারা দুটির অধীনে পুলিশের ওয়ারেন্টের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নাই। কিন্তু এই পার্থক্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। কেননা পুলিশ আদালতের কাছ থেকে দ্রুত ওয়ারেন্ট নিতে সক্ষম। অন্যদিকে এই বাধ্যবাধকতা দেশের সাধারণ নাগরিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষা।

কাজেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ছাড়া ভিডিও প্রকাশকারী ওই ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হতো না বলে জয়ের দাবি ভিত্তিহীন।

এছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এই ধারাসহ অন্যান্য ধারা নিয়ে যে সমালোচনা রয়েছে, জয় সেগুলো বুঝতে পারেননি বলেই মনে হচ্ছে। কুমিল্লার এই ঘটনার মতো অপরাধ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিচার করা গেলেও বাস্তবতা হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অন্যায্যভাবে এই আইন প্রয়োগ করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই আইনের অধীনে বিভিন্ন ব্যক্তিকে “মানহানি” বা “রাষ্ট্রের সমালোচনা” বা “জাতির জনকের” সমালোচনার জন্য দণ্ডিত করা হচ্ছে। এসব এখন নিত্যনৈমত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন এই আইনের আওতায় আসলে শুধু স্বাধীন সাংবাদিকতা বা সরকারের সমালোচনার করার সাহস দেখানো মানুষগুলোকেই দণ্ডিত করা হচ্ছে।

সরকারের আইসিটি উপদেষ্টা সুযোগসন্ধানী জয় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণের ঘটনাটি লুফে নিয়েছেন। এই সুযোগে তিনি এই বিতর্কিত আইনকে প্রয়োজনীয় বলে দেখাবার চেষ্টা করছেন। একথা মনে রাখা প্রয়োজন, এই আইন মূলত ব্যবহার হয় তার (জয়)  প্রধানমন্ত্রী মা ও মায়ের অধস্তন নেতা-মন্ত্রীর সমালোচনাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে।

ডেভিড বার্গম্যান, (@TheDavidBergman), ব্রিটেন-ভিত্তিক সাংবাদিক — নেত্র নিউজের ইংরেজি বিভাগের সম্পাদক।

প্রথম প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজিতে, ২৯ অক্টোবর, ২০২১