বমরা বাংলাদেশেরই নাগরিক, তাদের প্রতি আচরণ তেমনই হতে হবে
পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনোপ্রকার কৈফিয়ত বা জবাবদিহিতা ছাড়াই রাষ্ট্র কাঠামোগতভাবে নিপীড়িত বম জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার হরণ করে চলেছে। “নতুন বন্দোবস্তের” বাংলাদেশেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে উর্দিতন্ত্র।

২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল বান্দরবানের রুমা উপজেলা থেকে তিনজন বম নারীকে তাদের নিজ ঘর থেকে তুলে নেওয়া হয় কোনো ধরনের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা ব্যাখ্যা ছাড়াই। সঙ্গে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের সঙ্গে থাকা চারজন শিশুকেও। সবচেয়ে ছোট শিশুটির তখন বয়স ছিল মাত্র ছয় সপ্তাহ। এরপর এক বছর পার হয়ে গেলেও বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় শিশুসহ সাতজনের সবাই এক বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে বন্দী ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে এবং বারবার তাদের জামিন আবেদন খারিজ করা হয়েছে।
সেই ঘটনার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, ২০২৪ সালের ৮ এপ্রিল, তখন সেখানে চলমান গণগ্রেপ্তারের অংশ হিসেবে একই উপজেলার পঁচিশ বছর বয়সী লালনুন কিম বম ও তার দুই বোনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। লালনুন কিম বম ছিলেন বান্দরবান সরকারি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের বিএসএস শিক্ষার্থী। স্ট্রোক হওয়ার পর কিম এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। চিকিৎসার সুবিধার জন্য অধিকাংশ সময় তিনি জেলা শহরেই থাকতেন। ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি, যখন তাকে আটক করা হয়। আটক থাকা অবস্থায় তাকে কয়েকবার হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু তার যে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা-সেবার প্রয়োজন ছিল, তা তিনি পাননি। ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে করা একটি সিটি স্ক্যান নিশ্চিত করে যে, তিনি পুনরায় স্ট্রোকের ঝুঁকিতে রয়েছেন এবং ডাক্তাররা তাকে ধারাবাহিক চিকিৎসার অধীনে থাকার পরামর্শ দেন। সেই চিকিৎসা-সেবা তাকে এখনো প্রদান করা হয়নি। ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই এই তিন বোন কারাগারে বন্দী রয়েছেন। এই দুরাবস্থা সমাধানের কোনো নিশ্চয়তা না পেয়ে তাদের বাবা-মা প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণা এবং অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
বমরা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটি আদিবাসী খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী। ২০২৪ সালের এপ্রিলের শুরুর দিকে, রুমা ও থানচিতে সংঘটিত একটি নাটকীয় ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এরপর রাষ্ট্রের যৌথ বাহিনী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) নামক একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র দলের বিরুদ্ধে কথিত অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযান-প্রক্রিয়ায় “বম” পরিচয় এবং রাষ্ট্রদ্রোহী পরিচয়ের মধ্যে কার্যত তেমন কোনো পার্থক্য রাখা হয়নি। বরং কেবল বম সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়ার কারণেই যেন এখন যে-কাউকে সন্ত্রাসী বলে ধরে নেওয়া, সুষ্ঠু বিচারপ্রক্রিয়া ছাড়া আটক রাখা বা আরও মানবেতর আচরণ করা বৈধ হয়ে গেছে।
২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত কেএনএফ-এর বিরুদ্ধে অভিযানের নাম করে বম জনগোষ্ঠীর উপর ভয়াবহ দমন-পীড়ন চালানো হয়, যার ফলে চার হাজারের অধিক বম সদস্য নিজেদের পৈতৃক ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। নেত্র নিউজের একটি তদন্তে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৭ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ২২জন সাধারণ বম নাগরিককে সামরিক বাহিনী হত্যা করেছে এবং কমপক্ষে ১১জন নারীকে গ্রেপ্তারের করা হয়েছে, যারা ১২ মাসেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে বন্দী রয়েছেন। গত এক বছরে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছেন প্রায় দুইশ বম নাগরিক। তাদের মধ্যে অনেককে রাতের অন্ধকারে জোর করে তুলে নেওয়া হয়েছে, আর বাকিরা আটক হয়েছেন যৌথবাহিনীর ঢালাও অভিযানে।
সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের নামে পরিচালিত হওয়া এইসব অভিযানের শিকার অসংখ্য বন্দী বিচারের আগেই এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আটক অবস্থায় দুঃসহ জীবনযাপন করে আসছেন। তাদের আইনজীবীরা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের পরিবারের সদস্যরা জানেনও না ঠিক কী অভিযোগে তাদের স্বজনদের আটক রাখা হয়েছে, বা আদৌ তাদের বিরুদ্ধে ন্যায্য কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না। ফলে তীব্র আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের দিন কাটছে। নিরাপত্তা বাহিনী এই গোটা জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, যার ফলে খাদ্য ও ওষুধপত্রসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তারা চরম সংকটে পড়েছেন।
তাদের স্বাধীনতা এখন অত্যন্ত সীমিত, এবং এই অকার্যকর “স্বাধীনতার” মধ্যেও তাদের জীবন নিংড়ে নিঃশেষ করে ফেলা হচ্ছে—বমরা এখন রাষ্ট্রীয় হেফাজতে মারা যাচ্ছেন। মাত্র তিন মাসের মধ্যে তিনজন বম পুরুষ— লাল থে্লং কিম বম, সাংময় বম ও ভান লাল রুয়াল বম বন্দী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। এদের তিনজনের বিরুদ্ধে প্রায় একই অভিযোগে মামলা করা হয়েছিল, কিন্তু একজনকেও দোষী সাব্যস্ত করা যায়নি। বন্দিদশায় তিনজনেরই স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটে। অথচ এই তিনজনের ক্ষেত্রেই হয় পর্যাপ্ত চিকিৎসা-সেবা প্রদান করতে বিলম্ব করা হয়, আর নাহয় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে তাদের একদমই বঞ্চিত করা হয়। যতক্ষণে তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয় ততক্ষণে তাদের শারীরিক অবস্থার এতটাই অবনতি ঘটে যে, সেখান থেকে আরোগ্যের পথ আর খোলা ছিল না। বম জনগোষ্ঠীর এই দুর্দশা নিয়ে জনপরিসরে কোনো অর্থবহ প্রতিবাদ নেই, আলোচনা নেই। আর এই নিরবতার সুযোগে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি কোনো কার্যকর প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই অব্যাহত রয়েছে।
একটি গোটা জনগোষ্ঠীকে কীভাবে প্রায় রাতারাতি অপরাধী সাব্যস্ত করে ফেলা হয় তা বুঝতে হলে আমাদের দেখতে হবে, এখন যে শক্তি মোকাবেলার দোহাই দিয়ে রাষ্ট্র নিজের দমন-পীড়নের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করছে, সে শক্তি সৃষ্টিতে রাষ্ট্র নিজেই কীভাবে ভূমিকা রেখেছে। কেএনএফের সূত্রপাত ঘটে কুকি-চিন ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (কেএনডিও) থেকে, যা ২০০৮ সালে নাথান বম ও তার ভাই ভানচুনলিয়ান বমের হাত ধরে বান্দরবানের রুমায় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমে প্রতিষ্ঠানটি উন্নয়নকেন্দ্রিক সংগঠন হিসেবে কাজ শুরু করলেও, শীঘ্রই তা একটি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়। ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইন্ডিজেনাস অ্যাফেয়ার্সের (আইডাব্লিউজিআইএ) একটি স্বাধীন তদন্ত অনুযায়ী, উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা নাথানের কার্যক্রমকে বৈধতা, উপকরণগত সহায়তা এবং প্রকাশ্য সমর্থন প্রদান করেছিলেন। এর অন্যতম নজির হলো ২০১৩ সালে কেএনডিও’র কার্যালয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান— যেখানে ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ সিদ্দিকী নিজে উপস্থিত ছিলেন।
তবে বয়োজ্যেষ্ঠ বমরা নাথানের এই প্রকল্পটিকে প্রথম থেকেই সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন। সামরিক পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঝুঁকি এবনং জো জাতীয়তাবাদের বিভাজনমূলক রাজনীতি— উভয়ই প্রবীণ বমদের সমানভাবে শঙ্কিত করেছিল। তারপরও তরুণ বম পুরুষদের ছোট একটি অংশ ক্ষমতার প্রতিশ্রুতিতে প্রলুব্ধ হয়ে নাথানের প্রধান সমর্থকগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। কেএনএফ ও নিরাপত্তাবাহিনীর মধ্যকার এই মৌন আঁতাত ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে হঠাৎ করেই নতুন দিকে মোড় নেয়— যখন থেকে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) কেএনএফের ওপর প্রকাশ্যে ক্র্যাকডাউন শুরু করে।
দশকের পর দশক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি একটি স্থায়ী সামরিক অধ্যুষিত সীমান্ত অঞ্চল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, যেখানে শাসনের ভিত্তি আজও দখলদারিত্বের যুক্তি। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তি, যা একসময় সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বায়ত্ত্বশাসনের স্বীকৃতির ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল, বাস্তবায়নের অভাবে এখন শুধু রাষ্ট্রের অসততা এবং নিদেনপক্ষে চরম ব্যর্থতার সাক্ষ্য বহন করে। পাহাড়ে সামরিক দাপট এতটাই লাগামহীনভাবে বেড়েছে, যে তার বিস্তৃতি ও কার্যক্রম প্রায়শই বেসামরিক প্রশাসনের ক্ষমতাকেও অতিক্রম করে।
রাষ্ট্র যখন কোনো গোষ্ঠী, ইস্যু বা জনগোষ্ঠীকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে এবং সেই হুমকির অজুহাতে আইনবহির্ভূত ও মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগকে বৈধতা দেয়, তখন সেই প্রক্রিয়াকে বিশেষজ্ঞরা ‘নিরাপত্তাকরণ’ (securitisation) বলে থাকেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে এই “নিরাপত্তাকরণ” দীর্ঘদিন ধরে একটি সাংগঠনিক নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। একবার কোনো জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তার ছাতার নিচে আনা গেলে, তাদের অমানবিকীকরণ, অর্থাৎ মানবিক মর্যাদার বিলুপ্তি সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়। এরপর গণতান্ত্রিক অধিকার ও আচরণবিধি তাদের ক্ষেত্রে আর প্রযোজ্য থাকে না। এই পরিস্থিতিতে রাজনীতি সরিয়ে জায়গা নেয় শাসন, অধিকার-রক্ষার বদলে আসে ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনা। “সামগ্রিক মঙ্গলের” নামে, নিরাপত্তার চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষার আড়ালে তখন সবকিছুই অনুমোদনযোগ্য হয়ে ওঠে।
এই গতিশীলতা আগের শাসনব্যবস্থার হাত ধরে হঠাৎ করে জন্ম নেয়নি, আর কেবল ক্ষমতার পালাবদলে এটি বিলীনও হবে না। গত পনেরো বছর ধরে হাসিনা সরকারের অধীন যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত ধ্বংস সাধিত হয়েছে, তা যথার্থভাবেই সমালোচনার মুখে পড়েছে। কিন্তু এই তথাকথিত পরিবর্তনের মুহূর্তেও রয়ে গেছে এক নীরবতা যা আমরা ভাঙতে সাহস করি না। এক শক্তি, যার নাম উচ্চারণ করতেও আমরা ভয় পাই— সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিহীন এবং ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা।
আমরা স্বীকার করি বা না করি, শাসনব্যবস্থার সামরিকীকরণ এখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বুনিয়াদি যুক্তিতে পরিণত হয়েছে। আর এই যুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে ধারণ করেছে তার সবচেয়ে সহিংস রূপ। ঘোষিত কোনো জরুরি অবস্থা না থাকলেও অঞ্চলটি পরিণত হয়েছে কার্যত এক দখলকৃত ভূখণ্ডে। গণগ্রেপ্তার, অগ্নি-অভিযান, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং বিচারবিহীন বন্দিত্ব— এসবকিছুই এখানে এখন স্বাভাবিক। আর এই ভয়াবহ বাস্তবতা নিয়ে আমরা নির্বিকার।
যেসব সাংবাদিক এই বিষয়ের প্রতি সহানুভূতিশীল, তারাও প্রতিবেদন করার আগেই নিজেদের ভাষা নিয়ন্ত্রণ করেন, কারণ তারা জানেন, কিছু বিষয় উচ্চারণযোগ্য নয়, কিছু বাস্তবতা স্বীকার করাও পেশাগত কিংবা ব্যক্তিগত ঝুঁকির কারণ হতে পারে। জনগোষ্ঠীর আটক-নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত অ্যাক্টিভিস্টদের পরিচালিত পেজগুলো কোনো সতর্কতা বা ব্যাখা ছাড়াই সামাজিক মাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে, মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো নিরাপত্তা সংস্থার প্রেস বিজ্ঞপ্তিগুলোকেই একমাত্র সত্য হিসেবে হুবহু প্রকাশ করে যাচ্ছে। এই “নতুন বন্দোবস্তের” বাংলাদেশেও কিছু জিনিস রয়ে গেছে প্রশ্নের উর্ধ্বে, তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো, উর্দি। আমরা সংস্কারের কথা বলি, অথচ এই সত্যের মুখোমুখি হই না যে, কাঠামোগতভাবেই কিছু প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব টিকে আছে গণতন্ত্রকে সহায়তার জন্য নয়, বরং নিজেদেরকে গণতন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে।
বাংলাদেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়ে গেছে একটি বিপরীতধর্মী বাস্তবতা। একদিকে রাষ্ট্র দাবি করছে, সে গণতন্ত্রের পথে ফিরে এসেছে; অন্যদিকে, গণতন্ত্রের মাধ্যমে যেসব অবকাঠামোগত সহিংসতা বিলুপ্ত করার কথা ছিল, সেগুলোকেই রাষ্ট্র আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করছে। আসল সমস্যা হলো, কর্তৃত্ববাদের হাতিয়ার— বিশেষ আইন, ইচ্ছাধীন বলপ্রয়োগ, এবং নজরদারিমূলক আমলাতন্ত্র— এখন রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। পাহাড়ে, যেখানে আইনের শাসন ও বলের শাসনের সীমারেখা দীর্ঘদিন ধরেই ঝাপসা, সেখানে এই রূপান্তরগুলো বরাবরই আরও নিষ্ঠুর, এবং দৃশ্যত আরও সম্পূর্ণ।
পাহাড়ে ন্যায়বিচারের কথা বলা মানে, রাষ্ট্র ও তার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যকার সম্পর্ককে নতুনভাবে ভাবতে— কার জীবনের ওপর সম্মতির ভিত্তিতে শাসন চালানো হয়, আর কার ওপর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আমাদের এই অনুচ্চারিত সত্যের মুখোমুখি হতে হবে যে, সুরক্ষা ও সামরিক বাহিনী এখন বাংলাদেশে স্ব-শাসিত ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে বিরাজ করছে। তারা নিজ হাতে গড়ে তুলছে হুমকি ও বৈধতার ভাষা, যা রাষ্ট্রের সকল আচরণ ও প্রতিক্রিয়াকে পরিচালিত করছে। তারাই সীমারেখা নির্ধারণ করছে— কী বলা যাবে, কী বলা যাবে না। আর ঠিক করে দিচ্ছে কারা পরিপুর্ণ নাগরিক অধিকার ও সুরক্ষার দাবিদার হতে পারবে, আর কারা পারবে না। ●
সুস্মিতা এস. পৃথা একজন সাংবাদিক ও গবেষক