একাডেমিক ফ্রিডম বলতে যা বুঝি, সেটাতে পৌঁছেছি বলে মনে হয় না: সামিনা লুৎফা
নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সামিনা লুৎফা (নিত্রা) "মুখোমুখি" হয়েছিলেন নেত্র নিউজের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অধিকারকর্মী সামিনা লুৎফা (নিত্রা) দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক অধিকার বিষয়ক নানা আন্দোলনে সক্রিয়। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিসর ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ কতটা ফিরেছে; বাকস্বাধীনতা, ভিন্নমত, নারী অধিকার এবং শিক্ষকদের একাডেমিক স্বাধীনতারই বা হাল হকিকত কী, তা মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছেন তিনি। এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন নেত্র নিউজের। তার সঙ্গে ছিলেন সুরাইয়া সুলতানা (বীথি)।
বীথি: নানান ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতায় শিক্ষকরা ক্লাসরুমে ঠিকমতো ক্লাসও নিতে পারেননি। সবসময় নিজেদেরকে এক ধরনের সেন্সরশিপের ভেতর দিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে বা নানান ধরনের চাপে ছিলেন। সেখান থেকে আসলে এখনকার পরিস্থিতি কী?
সামিনা লুৎফা: আসলে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু ক্লাসরুমের বাস্তবতা যে খুব পাল্টে গেছে, এমন না। কাদের জন্য না, বিশেষ করে যদি আমরা যেটাকে সত্যিকার অর্থে একাডেমিক ফ্রিডম বলি, সেটা যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে সেই থেকে এখনো আমরা এমন অনেক বিষয় নিয়ে পড়াই না বা কথা বলি না, যে বিষয়গুলো সমাজে নানান ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। আগে যেমন যারা ক্ষমতায় ছিলেন, সেই ক্ষমতায় থাকাদের বিরুদ্ধে তেমন কিছু বলা একটু কঠিন ছিল এবং সেক্ষেত্রে নানান রকম সেলফ সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে আমাদেরকে কথা বলতে হতো। কিন্তু এখনো, ধরেন, লিঙ্গ বৈচিত্র্য নিয়ে কথা বলা কঠিন। অনেক ধরনের ধর্ম এবং ধর্মের নানান রকম দিক নিয়ে কথা বলা কঠিন, মুশকিল রয়েছে। তো, সেগুলো এখনো চলে যায়নি। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি যেহেতু এই দুটো বিষয় নিয়ে পড়াই না, আমি ক্লাসে পড়াই রাজনীতি নিয়ে, আমি ক্লাসে পড়াই গবেষণা কী করে করতে হয়, সেটা নিয়ে। সেই অর্থে হয়তো সরাসরি আমাকে সেটা এফেক্ট করে না। কিন্তু আপনাদের নিশ্চয়ই জানা আছে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন উদ্যোগ বিভাগের একজন শিক্ষক, তিনি একটি কোর্স পড়ানো ছেড়ে দিয়েছেন, এই কথা বলে যে, উনি এই কোর্সটি পড়াতে গেলে শিক্ষার্থীদের ভেতর থেকে যে ধরনের রেসপন্স আসছিল তাতে তিনি নিরাপত্তার অভাব বোধ করেছেন। সেজন্য উনি কোর্সটি পড়ানো ছেড়ে দিয়েছেন। এটা নিশ্চয়ই আমাদেরকে এটা… এবং এটা পোস্ট ফিফথ অফ আগস্ট। তার মানে আমরা যে রকমটা ভেবেছি যে, কথা বলার স্বাধীনতা কিংবা একাডেমিক ফ্রিডম বলতে আসলে যা বুঝি আমরা, সেটাতে পৌঁছেছি, তেমন কিন্তু আমার কাছে মনে হয় না। আরো যেটা ঘটেছে ফিফথ অফ আগস্টের পরে, সেটা হচ্ছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেহেতু এমন ধরনের শিক্ষকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করে রেখেছিলেন, যারা একটি বিশেষ দলের হয়ে কথা বলতেন, বিশেষ দলের হয়ে কাজ করতেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা একেবারে দলের ফুড সোল্ডারের মতো ছিলেন। সুতরাং আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১শ জন শিক্ষক ২০১৮ সালের নির্বাচনের পরদিন আওয়ামী লীগকে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছিলেন।
সুতরাং এই মানুষগুলো কিন্তু এখনো এখানে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভেতর আছেন এবং তারা যেইভাবে পড়াতেন বা যে ধরনের সংস্কৃতি তৈরি করে রেখেছিলেন, সে সংস্কৃতিতে আওয়ামী বয়ানের বাইরে কোনো কথা বলতে গেলে নানান রকম নিবর্তনের শিকার হতে হতো। সেটা শিক্ষার্থীদের হতে হতো, শিক্ষকদেরকেও হতে হতো। কারো কারো জন্য জেল-জরিমানা পর্যন্ত হয়ে গিয়েছিল, যেরকম আমরা জানি চট্টগ্রামের মাইদুল কিংবা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সিরাজুম মুনিরা— এদেরকে তো গত আমলে কথা বলার অপরাধে, ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার অপরাধে এদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, এরা জেলে গিয়েছেন, ইত্যাদি।
আবার অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের তো ভয়াবহ নিপীড়নের মধ্যে থাকতে হতো। কিন্তু ধরেন, এই শিক্ষকরা… ৫ আগস্টের পরে যেটা ঘটেছে, এদের অনেকের বিরুদ্ধে বয়কট, অনেকের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়ে শিক্ষার্থীরা তাদেরকে নানান রকম চাপের মধ্যে ফেলেছেন। সেই সমস্ত কারণে আমরা বুঝতে পারি যে, একটা শিক্ষাঙ্গনের একাডেমিক ফ্রিডম বলতে আমরা যেটাকে বুঝি যে, আমি যে বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে চাই, সে বিষয়টা নিয়ে যেন আমি গবেষণা করতে পারি। যে বিষয়টা নিয়ে আমি পড়াতে চাই সে বিষয়টা নিয়ে যেন আমি ডিসকাস করতে পারি। আমার সাথে আরেকজনের ভিন্নমত থাকতে পারে কিন্তু ক্লাস তো ডিসকাশনের জায়গাও বটে এবং এই ডিসকাশনের যে একটা সুস্থ পরিবেশ, সেই পরিবেশটা কিন্তু রিস্টোরড হয়নি।
বীথি: এই প্রসঙ্গেই আমি আপনাকে আরেকটু জিজ্ঞেস করতে চাই যে, আপনারা শ্রেণিকক্ষে যখন পড়াবেন তখন তো আসলে রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন, সমাজ নিয়ে কথা বলেন এবং আপনি একজন সমাজবিজ্ঞানী। তো, সেখান থেকে যখন একজন মানুষ, যিনি ভিন্ন যৌন-বৈচিত্র্যের বা যার আসলে পরিচয়টা হচ্ছে, একটা অন্য কমিউনিটি বা অন্য একটা গোষ্ঠী থেকে এসেছেন, আদিবাসী গোষ্ঠী থেকে এসেছেন, সেক্ষেত্রে এই ব্যালেন্সটা কীভাবে করেন? কারণ, যে রাষ্ট্র নাগরিকের মর্যাদা ঠিকমতো দেয় না, অধিকার ঠিকমতো দেয় না, সেই ছাত্রগুলো বা ছাত্রীগুলো যখন আপনার ক্লাসে আসছে একইসঙ্গে তখন আপনি কেমন বোধ করেন একজন শিক্ষক হিসেবে? আপনি কি তাদের কাছে সবাইকে সেই সমান ট্রিটমেন্ট… যদি আমি বলি, একইভাবে সবাইকে দেখতে পারেন কি না?
সামিনা লুৎফা: আমি ব্যক্তিগতভাবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, যাতে কারো পরিচয়, সেটা তার রাজনৈতিক পরিচয় হতে পারে, তার লিঙ্গগত, তার জাতিগত পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয়— এগুলো কখনো আমার খেয়াল করার মতো কোনো বিষয় না। শিক্ষকের পক্ষে এটা একেবারেই অনুচিত। তিনি খাতায় যা লিখছেন, তিনি এটেন্ডেন্স এবং পার্টিসিপেশনে যা বলছেন, সেখানে তাকে আমার এসেস করতে হয় বা ইভালুয়েট করতে হয়। এর বাইরে তার কোনো পরিচয় শিক্ষক হিসেবে আমাকে প্রভাবিত করা অনুচিত বলে আমি মনে করি। সেটা আমাকে করেও না ব্যক্তিগতভাবে।
কিন্তু হ্যাঁ, আমি যদি একজন আদিবাসী শিক্ষার্থীর কথা বলি যে, তারা যখন ক্লাসে প্রবলভাবে বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে বসে ক্লাস করেন এবং তখন যখন আমরা এই ধরনের আইডেন্টিটি নিয়ে বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে যে ধরনের মানুষ নিপীড়ন বা সহিংসতার শিকার হয়, সেগুলো নিয়ে যখন আমরা পড়াই, তখন আমরা চেষ্টা করি যে, আমি অন্তত চেষ্টা করি যে, ক্লাসে ভিন্ন জাতিগত পরিচয়ের মানুষদের মতামতটা শুনতে, তারা কিসের সম্মুখীন হচ্ছেন সেটা জানতে। যাতে করে যারা আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠদের মধ্যে পড়ি, তারা অনেক সময় ব্লাইন্ড থাকে। অন্যান্যদের নিপীড়িত যে লাইফ এক্সপেরিয়েন্স আমরা যেটাকে বলি, জীবনের যে অভিজ্ঞতা, সেটা সম্পর্কে অনেক সময় ব্লাইন্ড থাকে। তার ফলে আমাদের বিভাগে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সব ধরনের… আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যে প্রান্তিক মানুষদের জন্য যে জায়গাগুলো আছে, যে পজিটিভ অ্যাকশন ডিসক্রিমিনেশন আছে, সেটা কিন্তু আমাদের বিভাগে প্রায় সম্পূর্ণতই… চেষ্টা করা হয় যে, সেখানে রাখতে। কারণ আমরা তো পড়াই মানুষের প্রান্তিকতা এবং তার ভার্নারেবিলিটির জায়গাগুলো। এবং সমাজবিজ্ঞানের একটা বিরাট অংশজুড়ে স্ট্রাটিফিকেশন, রেসিজম, জেন্ডার, এগুলো পড়তেই হয়, সেক্সচ্যুলিটি… কী করে আমরা কমিউনিকেশন করবো, কী করে আমরা একটা অনেক বেশি বৈষম্যহীন সমাজের কথা চিন্তা করবো বা কোথায় কোথায় বৈষম্যগুলো মানুষকে পিছিয়ে দেয়, এগুলোই তো আমাদের পড়ানোর বিষয়। সুতরাং সেই অর্থে এগুলোতে আমাদের অনেক বেশি ওপেনলি বলতে হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনো, ধরেন গত আমলে শেখ হাসিনাকে নিয়েও কথা বলতে দ্বিধা করিনি। সো, ওই সমস্যাটা আমার হয় না। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় যে, এখানে পড়ানোর ক্ষেত্রে আমাদের যে অবজেক্টিভ লেন্সটা থাকে, একটা বস্তুনিষ্ঠতার জায়গা থাকে, সেটা যদি শিক্ষকরা মেইনটেইন করেন খুব বেশি সমস্যা হয় না।
বীথি: আপনারা শিক্ষকরা, আমরা জানি যে, তাদেরকে পিতা বা মাতার মতন করে দেখা হয়, অভিভাবক গুরুজন— এভাবে দেখা হয়। সেই শিক্ষার্থীরা যখন আপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তখন একজন শিক্ষক হিসেবে আপনার কেমন লাগে?
সামিনা লুৎফা: এটা খুব কঠিন একটা প্রশ্ন, কারণ, শিক্ষক হিসেবে আমরা কিছু জিনিস তো ক্লাসে বলি। কিছুর সাথে কারো দ্বিমত থাকতে পারে এমনকি আমি এখন যা বলছি সেটা নিয়েও আমার শিক্ষার্থীদের সাথে দ্বিমত থাকতে পারে। সে দ্বিমতের জায়গা রেখেই আমরা ক্লাসে পড়াই, আমরা বই দেই। তাদেরকে বলি আরো ভিন্ন বই আপনারা পড়তে পারেন, যেটা আপনাদের মতামত আছে সেটা যদি আমার সাথে না মেলে সেটা নিয়ে আমরা ডিসকাস করতে পারি। আপনি খাতায় লিখতে পারেন। এস লং এস ইউ ক্যান প্রুভ ইউর পয়েন্ট, আই উইল টেক ইট। কিন্তু সে কারণেই শিক্ষার্থীরা আমাদের সাথে দ্বিমত থাকবেন, ভিন্নমত থাকবেন, তাতে আমার কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু ধরেন, আপনি যে প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছেন, সে প্রসঙ্গটি খুব অদ্ভুত প্রসঙ্গ। এটা এতো সহজ না বিষয়টা, কারণ, আমার কাছে মনে হয়েছে যে, আমি যখন সংস্কার কমিশন ঠিক না, এটা ছিল পাঠ্যপুস্তক সংস্কারের একটা কমিটি। এই কমিটিটার আসলে খুব একটা প্রয়োজনও ছিল না। এটা যে কেনো করা হয়েছিল সেটা আমি জানিনা। কারণ, এই কমিটিটা হওয়ার আগেই যেটুকু সংস্কার করবার সে সংস্কার আমরা করে ফেলেছিলাম। কারণ, এনসিটিবি বলে যে জিনিসটা আমরা জানি, আছে, সেখানে পাঠ্যপুস্তক সংস্কার করার জন্য, প্রত্যেকটা সাবজেক্টের বিষয়ভিত্তিক স্পেশালিস্ট গ্রুপ থাকে। তো, আমি যেহেতু সমাজবিজ্ঞানের পিএইচডি ডিগ্রিধারী একজন মানুষ, যিনি ৩০ বছর ধরে প্রায় সমাজবিজ্ঞান পড়াচ্ছি, পড়ছি, সুতরাং আমার তো সমাজবিজ্ঞানের এক্সপার্ট হিসেবে যুক্ত হওয়াতে নিশ্চয়ই কারো আপত্তি থাকার কথা না। তো, এই এক্সপার্ট গ্রুপগুলো প্রত্যেকটা বই এডিট করে ফেলেছিল। কিন্তু এই এডিট করা বইয়ের ছাপা হওয়ার প্রক্রিয়া, ইত্যাদির বিষয়ে কিছু এডমিনিস্ট্রেটিভ ডিসিশন নেওয়ার খাতিরেই সম্ভবত সচিবালয় থেকে এই কমিটিটি করা হয়েছিল। কমিটিটি করার আগে আমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হলে আমি এবং কামরুল হাসান মামুন, আমরা দুজনেই বলেছিলাম যে, কমিটিতে আমাদের নাম যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু সামহাউ এই কমিটিটা হয়ে যায় এবং তারপরে যেটা ঘটে, সেটা হচ্ছে যে, একটা বিরাট প্রতিক্রিয়া আসে এবং আসলে আমাদেরকে ঘাড়ধাক্কা দেওয়ার চাইতে পুরো কমিটিটাই বাতিল হয়ে যায়। কারণ, আমি প্রথমেই বলেছি, কমিটিটা আসলে দরকার ছিলনা, বাই দা টাইম কমিটিটা তৈরি হয়েছিল, কাজ আমরা প্রায় শেষেই করে ফেলেছিলাম। সুতরাং সেই অর্থে এটা মেসেজ হিসেবে দেশের জন্য একটা খারাপ মেসেজ ছিল। কারণ, বোঝা গেছে যে, একটি বিশেষ গ্রুপ কোনো বিষয় প্রতিক্রিয়া দেখালেই যেন ওনারা সেটাতে ব্লকডাউন করছে, এটা আমাদের সরকারের দুর্বলতাকে খুব পরিষ্কার করে সকলের সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা আমার মতের সাথে একমত হবেন কি হবেন না, এটা নিয়ে আমি কখনো খুব বদার্ড হই না। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়, মানে বিভিন্ন রকমের, বিচিত্র রকমের জ্ঞানকাণ্ড এখানে এক জায়গায় থাকে এবং সেই জ্ঞানকাণ্ডগুলোর মধ্যে নানান রকম মতামত একে অপরের মধ্যে আদান-প্রদানও হয়। কোনোটাতে কেউ একমত হয়, কোনোটাতে হয় না। সুতরাং আমার বিভাগের শিক্ষার্থীরা করলে একটু তো কষ্ট লাগেই যে, আচ্ছা, তাহলে আমরা এতদিন ধরে যা পড়াচ্ছি তার কোনো মিনিং দাঁড়াচ্ছে না। কারণ আমরা তো এটুকু অন্তত শিখি যে, অন্যের মতকে সম্মান করতে হবে।
তার মতের সাথে না মিললে আরেকটা মত দেওয়া যেতে পারে কিন্তু সেটা হত্যাযোগ্য করে তোলা কিংবা তাকে বাতিল করা ইত্যাদি, এই জিনিসগুলো, আক্রমণ করা, সাইবার বুলিং, মিথ্যা কথা বলা, এগুলো আসলে ভয়ঙ্কর অপরাধ। এবং সে অপরাধগুলো আমার বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছে। সেগুলো আমি খুব একটা পাত্তা দেইনি। কারণ, আমরা হয়তো অনেক বছর ধরে অ্যাক্টিভিজম করার কারণে এই ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধের শিকার বহু বছর ধরে হয়ে এসেছি এবং তার ফলে এটাকে আমরা আসলে পাত্তা না দিতে শিখেছি। আমি বলছি না যে, এটা আমরা মেনে নিয়েছি। পাত্তা না দিতে শিখেছি। সেটা একটা অন্য আলাপ। তবে এখানে একটা জিনিস আমি না বললেই না, সেটা হচ্ছে যে, এই যে পাঠ্যপুস্তককে কেন্দ্র করে যে বিশাল ফিয়াসকোটা তৈরি করা হলো, এটা কিন্তু আমার বা কামরুল হাসান মামুনের ধর্মবিদ্বেষ… বা আমরা আসলে ধর্ম নিয়ে কিছু বলেছি, ব্যাপারটা এমনও না। জিনিসটা হচ্ছে, ওই জিনিসটাকে ব্যবহার করা হয়েছে, কারণ এনসিটিবি হচ্ছে একটা বিশাল বাণিজ্যের স্বার্থের জায়গা। এখানে অনেক অনেক কোটি টাকার বই, যারা প্রিন্ট করেন, (তাদের) থেকে শুরু করে বিশাল একটা সিন্ডিকেট আছে। এবং আমরা যখন ওই কমিটির প্রথম মিটিংয়ে গিয়েছিলাম বা একাধিক মিটিং হলেও আমরা আসলে বেশি মিটিংয়ে যাইনি, কারণ আমাদের এই সমস্ত সচিবালয়ের মিটিংয়ে যাওয়া ঠিক পোষায় না, আর কি। তো, আমরা যাইনি এবং তার ফলে প্রথম যে মিটিংয়ে গিয়েছিলাম, সেখানে আমরা খুব পরিষ্কার বলেছিলাম যে, কাগজের কোয়ালিটি থেকে শুরু করে কোনো কিছুতে কোনো ধরনের দুর্নীতির সুযোগ দেখা দিলেই আমরা যথেষ্ট গণ্ডগোল করবো এবং এই যে গণ্ডগোলের ব্যাপারটা, এটা আসলে অনেক ধরনের বিজনেস ইন্টারেস্টের সামনে বিরাট একটা ঝুঁকির ধারণা দিয়েছিল। এবং আমার ধারণা যে, এই বিজনেস ইন্টারেস্টের ঝুঁকির কারণেই তারা আমাদের বিরুদ্ধে এত বড় একটা ক্যাম্পেইন শুরু করেছিল এবং এটা আসলে আমাদের ব্যক্তি সামিনা লুৎফা বা ব্যক্তি কামরুল হাসান মামুনের ব্যাপার ছিল না। এটা ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিংবা আগের যে সিন্ডিকেট বিজনেস ইন্টারেস্ট ছিল, সেই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এবং আপনারা যদি একটু খেয়াল করেন যে, কোথা থেকে শুরু হয়েছে, তাহলে দেখতে পাবেন যে, এর সাথে পতিত আওয়ামী লীগের যারা সুবিধাভোগী এবং যারা ওই বিজনেস সিন্ডিকেটের অংশ, তাদের বিজনেস ইন্টারেস্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। সে কারণে তারা সবার আগে আমাদেরকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তো, এই জায়গাটা মনে রাখা জরুরি। সুতরাং কী দিয়ে আমাদেরকে ঘায়েল করা হচ্ছে, তার চেয়ে বড় কথা কার স্বার্থে আমাদেরকে ঘায়েল করার জন্য ওই কার্ডটা খেলা হচ্ছে। এবং এটা জরুরি বাংলাদেশের রাজনীতিকে, আগামী এক বছরের রাজনীতিকে বুঝতে। গত এক বছরের তো বটেই।
বীথি: এই যে আপনাকে সমকামিতার সমর্থক বলে অনলাইনে এক ধরনের হয়রানি চালানো হলো এবং আমাদের পাঠ্যপুস্তকে কিন্তু ভিন্ন লিঙ্গ ও যৌন-বৈচিত্র্যের মানুষদের কথা একেবারেই নেই। তো, সেখান থেকে একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে আপনি যৌন শিক্ষাকে কীভাবে দেখেন এবং পাঠ্যপুস্তকে এটার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আপনি কী ভাবেন?
সামিনা লুৎফা: প্রথম কথা হচ্ছে, পাঠ্যপুস্তকগুলো তো বিভিন্ন বয়সের ছেলেমেয়েদের জন্য লেখা। আমি আসলে সমাজবিজ্ঞানের অংশটুকু বলতে পারি। কিন্তু এই বিষয়ে ঠিক মতামতটা দেওয়ার জন্য একজন এডুকেশন রিসার্চারের মতামত বা তাদের এক্সপার্ট ওপিনিয়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। তো, সমাজে নানা রকম বৈচিত্র্যের মানুষ বিদ্যমান আছেন এবং এটা শুধু লিঙ্গের বৈচিত্র্য তা-ই নয়, আমাদের দেশে ধর্মের বৈচিত্র্য আছে, জাতিগত বৈচিত্র্য আছে, বিভিন্ন রকম অকুপেশনের বৈচিত্র্য আছে। এই বৈচিত্র্যগুলো যেন শিক্ষার্থীরা বা বাংলাদেশের মানুষ, যারা এই বইগুলো পড়বেন তাদের একটা ধারণা থাকে, সেটাই সুস্থ একটি সিলেবাস হবে। কিন্তু কোন বয়সের শিশুদের জন্য কোন ধরনের বৈচিত্র্য ইন্ট্রোডিউস করাটা বাঞ্ছনীয়, সে ব্যাপারে এক্সপার্টরা ভালো বলতে পারবেন। তবে এ কথা সত্যি যে, আমরা ২০১২ সালের যে সিলেবাস নিয়ে কাজ করেছি, আমরা কিন্তু ২০২১ এর সিলেবাস নিয়ে কাজ করিনি। ২১-এর সিলেবাসটা বাতিল করার পরে ১২ সালের যে পাঠ্যপুস্তক, সে পাঠ্যপুস্তক আমরা রিভাইজ করতে বসেছিলাম। এবং তার জন্য আমাদের মাত্র সময় দেওয়া হয়েছিল একমাস। আমার সামাজিক বিজ্ঞানের বই ছিল, আমি বলবো ক্লাস থ্রি থেকে শুরু করে ইলেভেন টুয়েলেভ পর্যন্ত, প্রত্যেকটি ইয়ারে অন্তত একটি এবং নাইন-টেনে সম্ভবত পৌরনীতি, ইতিহাস, অর্থনীতি, ভূগোল আলাদা বই। এই সমস্ত কিছু মিলে বিরাট পরিমাণ বই ওখানে। এবং এই বইগুলো ইতিহাস এবং সমাজ সম্পর্কে ভয়াবহ সব ভুল তথ্যে ঠাসা ছিল। সুতরাং, এই বইগুলোতে ভুল তথ্যগুলো সরানো আমাদের জন্য প্রথম এবং প্রধান কাজ ছিল। তারপরে রিপ্রেজেন্টেশন নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধানে যে ধরনের বৈচিত্র্যের বিষয়ে বলা আছে এবং সেই বৈচিত্র্যগুলো রিপ্রেজেন্টেড হচ্ছে কি না, সেটা দেখা আমাদের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেটা একজন সমাজবিজ্ঞানী এবং এক্টিভিস্ট হিসেবে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলে একটি জিনিস আমাদের বইয়ের মধ্যে ইন্ট্রোডিউসড হয়েছিল। যেটা সংবিধান থেকে এসেছে বলে তারা আমাদেরকে জানান। এবং তাদের এক ধরনের প্রবল বিরোধিতা ছিল, কোনোভাবে আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না। কারণ, এটা যেহেতু সংবিধানে নেই এবং এই ধরনের কোনো একটা বোধহয় পরিপত্র, আদেশ ইত্যাদিও আছে, ইত্যাদির কারণে।
তখন ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, এগুলো না বলে, এই ডিরোগেটরি শব্দটিকে ব্যবহার না করে, কী করে আমরা আমাদের নৃগোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য যতদূর সম্ভব, তাদের সম্মান এবং মর্যাদা দিয়ে ওই বইয়ের মধ্যে আনতে পারি, সেটা ছিল একটা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সেই কাজটি আমি মনে করি আমরা সর্বোচ্চভাবে করার চেষ্টা করেছি এবং এটা আমি একা না, আমাদের পুরো টিম এটা করেছে।
ইতিহাসের কিছু ভুল তথ্য ছিল, সেই জায়গায়, আর্কিওলজিক্যাল এভিডেন্স ব্যবহার করে সে তথ্যগুলোকে বাদ দেওয়া কিংবা ভূগোল বা ইকোনমিক্সে এক ধরনের নিউ লিবারেল ইকোনমিক ধারণাকেই একমাত্র এবং সবচাইতে বেশি স্বতঃসিদ্ধ বলে প্রমাণ করার এক ধরনের টোন আছে, বইগুলোর মধ্যে। সেই জায়গায় আমরা ভিন্ন ধরনের অল্টারনেটিভ আইডিয়াস, কিংবা ইকোনমিক মানেই শুধু প্রফিট, ইত্যাদি নয় বরং কী করে এটাকে একটা সাস্টেইনেবল ধারণার মধ্যে রাখা যায়, এর মধ্যে যে এনভায়রনমেন্ট, প্রকৃতি, মানুষ, অন্যান্য প্রাণী— এগুলো যে গুরুত্বপূর্ণ, সে ধারণাগুলোকে আমরা অবশ্যই আমাদের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতামতের সাপেক্ষে ওখানে যুক্ত করার বা রাখার চেষ্টা করেছি। এছাড়া ধরেন, ভূগোল এবং রাজনীতি বিজ্ঞান— এই সমস্ত জায়গায় অনেক ধরনের পুরনো ধারণা, যেগুলো হয়তো এখনকার লেটেস্ট রিসার্চে আর এটাকে এখন আমরা ধরতে পারি না। সমাজ, পরিবার ইত্যাদি নিয়ে অনেক পুরনো ধরনের ধারণা এই বইগুলোতে ছিল। যেগুলোকে আমরা রিমুভ করেছি। সেখানে আমরা মোর ইকুয়ালিটির দিকে, নারী-পুরুষের যে এক ধরনের সমতামূলক সম্পর্ক, একজন ভিন্ন কালচারাল বা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিয়ে যিনি আসছেন, তার মানে একজন আদিবাসী, একজন মারমা বা একজন গারো— তাকে কীভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছেলেমেয়েরা গ্রহণ করবে বা তার সাথে কীভাবে আচরণ করবে, যেটা মর্যাদাপূর্ণ, সেদিকে আমরা বইগুলোকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। তবে হ্যাঁ, আমরা লিঙ্গ বৈচিত্র্যের যে অন্যান্য দিক রয়েছে, সেগুলো নিয়ে এই বইগুলোতে কোনো আলোচনার জায়গাই নাই আসলে। সো, আমাদের এত সময় ছিল না যে, আমরা ওখানে ওই জায়গাটা তৈরি করতে পারি।
আমি আশা করবো যে, সামনে যখন… আবার আমরা জানি যে, নতুন শিক্ষাক্রম আসছে এবং এই নতুন শিক্ষাক্রমে নিশ্চয়ই আমরা এই বাংলাদেশকে, যে বৈষম্যহীন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ করার কথা বলে কিংবা একটা স্লোগান সামনে নিয়ে কিংবা এক ধরনের ট্রোপ ব্যবহার করে আমরা রাজনীতি করছি, সেই রাজনীতিটার আসল যে মর্মবাণীটা, তার মানে আসল অন্তর্ভুক্তির জন্য বিচিত্র রকমের মানুষ এই পৃথিবীতে আছে, সমাজে রয়েছেন এবং তারা এটা কোনো ওয়েস্টার্ন কনসেপ্টও না। বাংলাদেশের সমাজে কিংবা এই সাউথ এশিয়ার সমাজে সবসময়ই বিভিন্ন লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানুষের এক্সেস ছিল, এক্সেপ্টেন্স ছিল, তাদেরকে তাদের মত মর্যাদা দিয়ে রাখা হতো। সেটাকে নষ্ট করে, এটা একটা ওয়েস্টার্ন কনসেপ্ট— এগুলো বলাও একটা রাজনীতির অংশ। এই রাজনীতিটাকে বুঝতে হবে। এবং আমার মনে হয় যে, এই জায়গাটায় যেদিন আমরা পৌঁছাতে পারবো সেদিন আমরা বুঝতে পারবো যে, আসলে একটা সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের দিকে, ম্যাচিওরড একটা রাষ্ট্রের দিকে আমাদের সমাজ এগিয়ে যেতে শুরু করেছে। এবং এই জায়গাগুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। আপনি যেগুলোর কথা বলছেন— যৌন শিক্ষা কিংবা এগুলো অবশ্যই খুব জরুরি জিনিস।
বীথি: আদিবাসীদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলে যে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রাষ্ট্রের বা এমনকি রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ের, তো, সেখান থেকে একজন শিক্ষক হিসেবে আপনি আপনার শ্রেণিকক্ষে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের আসলে কী নামে ডাকেন? তাদেরকে কি আদিবাসী বলে…?
সামিনা লুৎফা: আদিবাসী শিক্ষার্থীই বলি। আদিবাসী বলি অথবা যদি তারা বলতে চান যে, তারা যদি কেউ আমাকে কখনো জানিয়ে থাকেন যে, তারা তার বিশেষ নৃগোষ্ঠীর নাম নামে পরিচিত হতে চান তাহলে তার নৃগোষ্ঠীর নামই বলি।
বীথি; সেক্ষেত্রে কি আপনাকে কোনো ধরনের জটিলতার মুখোমুখি কখনো পড়তে হয়েছে বা চাপে পড়তে হয়েছে?
সামিনা লুৎফা: এখনো হইনি কখনো। এখনো হইনি। কিন্তু এই যে আপনাকে বললাম এজন্য হতে পারি।
বীথি: আপনি বলছিলেন যে, পাঠ্যপুস্তকে সংস্কার করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শব্দটি সরিয়ে আদিবাসী বলে সম্বোধন করার যে চেষ্টাটা করেছিলেন, সেটাতে কি আসলে সফল হয়েছেন? মানে, রাষ্ট্র কি আপনাদের সেই সুপারিশটি গ্রহণ করেছে?
সামিনা লুৎফা: না, করেনি। পরবর্তীতে আমরা এটাকে সার্কামভেন্ট করেছি। কারণ, আমরা তো অনেক বছর ধরে এইগুলো নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করে এসেছি। সুতরাং আমরা সার্কামভেন্ট করেছি যে, আমরা চেষ্টা করেছি প্রতিটি নৃগোষ্ঠীর নিজের নামে তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং ভিন্ন জাতিসত্তা বলা হয়েছে, নৃগোষ্ঠী বলা হয়েছে, কিন্তু কোনোভাবে ক্ষুদ্র এই শব্দটি আর রাখিনি। এটা থেকে আমরা বইটাকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছি। আল্টিমেটলি সবগুলো জায়গায় পুরো রিভিশনটা হয়েছে। এই বিষয়ে আমি অবশ্য আপনাদেরকে গ্যারান্টি দিতে পারবো না, কারণ ততদিনে এই কাজটি নিয়ে এত ধরনের গন্ডগোল হয়েছে যে, তারপরে আমি আসলে খুব বেশি মনোযোগ দিইনি বইগুলোর ফাইনাল আউটকামের ক্ষেত্রে।
বীথি: কখনো কি আপনার এই ভিন্ন ভিন্ন যে পরিচয়গুলো রয়েছে সেগুলোর সঙ্গে কোনো সংঘর্ষ তৈরি হয়? বা কেউ কি আপনাকে, কোথাও যাওয়া যাবে না বা এটা করলে আপনার অন্য একটা সত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে— এ ধরনের কোনো চাপের মুখে পড়েছেন কি না?
সামিনা লুৎফা: না, চাপটা যা সেটা নিজের ভেতরে। বাইরের কেউ কখনো বলে না। তবে হ্যাঁ, পরিবার তো একটা চাপ দেয় যে, ধরেন এতো বেশি কেনো যেতে হবে… কারণ অনেক বেশি আক্রমণ হয় তো, তার ফলে পরিবার তো একটু সতর্ক করে, সতর্ক থাকতে চায়। এইসব ছাড়া আমার ওরকম… আসলে যেটা হয়, ধরেন, আমরা যখন আন্দোলনে ছিলাম কিংবা ধরেন আঠারো-এর আন্দোলন, সেটা নিরাপদ সড়ক, কোটা সংস্কার, যাবতীয় আন্দোলনে তো সামনে থেকেছি। তার ফলে কিন্তু প্রবলভাবে আমাদের প্রফেশনাল জীবনে আমরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। আমি প্রায় পুরো প্রফেশনাল লাইফেই… আমার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতার ২৪ তম বছর এবং আমাকে কিন্তু হাইকোর্টে কেস করে প্রফেসর পদে পদোন্নতি পেতে হয়েছে। এবং এটা হচ্ছে, চরম ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করে রাখা হতো, আমরা যারা আন্দোলন করতাম তাদের বিরুদ্ধে। এখন এই জিনিসগুলো হচ্ছে ধরেন, আগের রেজিমের একটা, কি বলবো, এটা তাদের একটা টুল ছিল। শুধু যে তারা আপনাকে সরাসরি মারপিট করে কিংবা ধরেন আপনার নামে কেস করে দেবে— ব্যাপারটা এরকম না। যেমন আমি যখন তোবার আন্দোলনে গিয়েছিলাম ২০১৪ সালে, তখন তো আমি পুলিশের এবং ওদের গুন্ডাদেরও মার খেয়েছি। তারপরে ধরেন, এই যে জুলাই আন্দোলনের সময় আমাদের নামে জিডি হয়েছে। আমাদের আরেক সহকর্মী আমাদের নামে জিডি করেছেন। এগুলো তো ডেফিনেটলি চাপ। কিন্তু আমরা পাত্তা দিইনাই, আর কি।
বীথি: আপনি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়েছেন। আপনি লেহাইয়ে পড়েছেন এবং তারপরে এখন দেখি প্রান্তিক একজন নারীও যখন আক্রমণের শিকার হন সেখানে আপনি ছুটে যান। সেটা আপনি কীভাবে করেন? আপনি কি সেখানে তখন একজন সমাজবিজ্ঞানী, একজন নারী অধিকারকর্মী হিসেবে সেখানে যান, নাকি সেখানে কোনো রিসার্চের বা গবেষণার মানসিকতা থেকে যান, নাকি নেহাতই একজন নারী আরেকজন নারীর পাশে দাঁড়াচ্ছেন— সেই জায়গাটা থেকে যাচ্ছেন?
সামিনা লুৎফা: আসলে আমার একাধিক পরিচয় থাকার কারণে এটা খুব কঠিন প্রশ্ন যে, আমি আসলে কি হিসেবে যাই। একজন নাগরিক হিসেবে তো বটেই কিন্তু বাদবাকি যেগুলোর কথা আপনি বলেছেন, এগুলো চিন্তার বিষয় আসলে। কারণ, সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে আমার কাজের এলাকাই হচ্ছে মানুষের আন্দোলন সংগ্রামকে এনালাইসিস করা, বোঝার চেষ্টা করা। আমি তো সোশ্যাল মুভমেন্ট নিয়েই কাজ করি। সুতরাং এটা যে একদিনে হয়েছে তা না। বরং আমার এই অ্যাক্টিভিজমের অভিজ্ঞতা থেকে একসময় আমার মনে হয়েছে যে, আসলে এটাই দেখা জরুরি। এটা দেখলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়। তার সাথে সাথে আমি নিজে একজন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে আমার কিছু দায়িত্ববোধ হয় সেখান থেকে থেকে আমি দৌড়ে যাই। আর এগুলোকে আলাদা করা খুব ডিফিকাল্ট। শিক্ষক হিসেবে এক ধরনের… পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে, আমাদের উপর এক ধরনের জাতীয় দায় আছে। আমাদের যেহেতু অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার একটা দায় রয়েছে, যেহেতু আমরা পড়ালেখা করেছি আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সিস্টেমে। তার মানে আমার শিক্ষার পুরো খরচটা বহন করেছে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ। আমি যখন লেহাইতে পড়তে গিয়েছি তখন ফুলব্রাইট স্কলারশিপে গিয়েছি। আমি যখন অক্সফোর্ডে পড়তে গিয়েছি তখন গিয়েছি কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে। এগুলো সবই তো বাংলাদেশের জনগণের জন্য বিভিন্ন দেশের স্কলারশিপ। সো, ওই অর্থে আমি বলবো যে, আমাদের উপর দায়টা অনেক বেশি। সো, ওই দায় তো আমার কিছুটা আছে। আর তার সাথে সাথে সবকিছুই একসাথে মিলে যায় আসলে। কোনটা যে কেন চালিত করে এটা এখন আর আমার পক্ষে আলাদা করা নিজের পক্ষেই খুব মুশকিল।
বীথি: আপনি এখনো যে অন্যায়-অত্যাচার বা বৈষম্যগুলো যখন দেখেন আপনি তখন প্রতিবাদী হন, সরব হন এবং কথা বলেন। সেখানে এখন কি আপনার সেই একই সহকর্মী এবং বন্ধুদেরকে পাশে পাচ্ছেন? মানে লড়াই কি সহজ হয়েছে, নাকি কঠিন হয়েছে? নাকি আগের মতই রয়েছে?
সামিনা লুৎফা: লড়াই কঠিন হয়েছে, ডেফিনেটলি কঠিন হয়েছে। কারণ, আমাদের বন্ধু-বিয়োগ হয়েছে প্রচুর। আমি জানিনা আপনাদের কতটুকু হয়েছে। কিন্তু আমি যেহেতু থিয়েটারও করি, থিয়েটারে একটা বিরাট সংখ্যক মানুষ, আমি বলব প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি কিন্তু আওয়ামী লীগের সমর্থক এবং তাদের কালচারাল ইন্যাপলোয়ার্স। সো, ওইখানে আমাদের, আমার একটা বিশাল বন্ধু-বিয়োগ হয়ে গেছে এবং তাদের সাথে প্রায় কথাবার্তা বলা সম্পর্কও অনেকের সাথে চলে গেছে। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে তাদের যে ভয়টা, তার চেয়ে আমার কাছে বড় ভয়ের ব্যাপার লাগে যে, আমি যখন অন্যায় হচ্ছে— আগের আমলে প্রতিবাদ করেছি, এই আমলেও করবো, এটাই স্বাভাবিক। এখন আমার বন্ধু ওখানে আছে বলে আমি করবো না, এটা একেবারেই আমার মাথায় কাজ করে না, এবং আমি সেটা করি। তার ফলে এখন যেটা হয়, আগে তো আমি জানতাম যে একটাই মাত্র জায়গা থেকে বিরোধিতা আসবে, প্রতিক্রিয়াটা এক জায়গা থেকে আসবে, আওয়ামী লীগের লোকজনের কাছ থেকে। এখন যে কোনটা বললে কার কোথায় গিয়ে লাগছে, এটা বোঝা একেবারে অসম্ভব ব্যাপার হয়ে গেছে। এবং একদিকে সরকারে থাকা প্রাক্তন সহকর্মী কিংবা বলা যায় যাদের সাথে আমরা বহুদিন আন্দোলন করেছি, তারা রয়েছেন। আবার আমার শিক্ষকতার সহকর্মীদের মধ্যেও একদল চলে গেছেন, বিভিন্ন জায়গায়, ভিসি-টিসি হয়ে গেছেন। সুতরাং তাদেরকে… তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি কোনো গন্ডগোল হয়, সেখানে যদি আমরা কথা বলতে যাই তখন তাদেরও কিন্তু উষ্মা আমাদের বিরুদ্ধেই হচ্ছে। এর মধ্যে আবার রয়েছে যারা সামনে আসতে চান ক্ষমতায় (ইতিমধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে), তাদের যে নানামুখী তৎপরতা এবং নানা ইন্টারেস্ট, এই সমস্ত কারণে বোঝা খুব মুশকিল যে, আমরা কোত্থেকে… সবচেয়ে সহজ হচ্ছে কোথাও থেকে কোনো ধরনের সাপোর্ট আশা না করা। সবাইকে ক্ষেপিয়ে দেওয়ার পরিস্থিতি এখন আছে, সবাই খেপে আছে এবং সবাই সাইবার বুলিং করে। সেই অর্থে এখন কাজটা কঠিন। এখন কাজটা আগের থেকে অনেক কঠিন।
বীথি: সাইবার বুলিং প্রসঙ্গে যদি জানতে চাই যে, আমরা দেখলাম জুলাই আন্দোলনে যেভাবে নারীরা একদম সামনের সারিতে থেকে আন্দোলনে ছিল, লড়াই করে গেছে, একদম কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, তখন কিন্তু কোনো ধরনের… কে নারী কে পুরুষ এই ধরনের পরিচয় নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা ছিলো না। কিন্তু তারপরে দেখলাম, যে নারীরা এখন সামনে আছে বা যাদেরকে আমরা বিভিন্ন কমিটিতে দেখি, রাজনৈতিক বলি বা মিডিয়াতে বলি বা যারা আপনার মতন শিক্ষক ছিলেন বা বুদ্ধিজীবী ছিলেন, তাদের প্রত্যেককে দেখলাম অনলাইনে বিশাল একটা বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন, হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং নানা ধরনের ফটোকার্ড বানিয়ে বানিয়ে তাদেরকে হেনস্তা করা হচ্ছে। তাদের পরিবারের সদস্য, নারী সদস্যদের পর্যন্ত হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে আসলে এই যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন একটা হলো অথচ নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যটা এখনো কোথাও সেই অর্থে বিলোপ হলো না। এবং আমি যদি বলি আপনি নিজেও তাদেরই একজন, যারা এই ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন। এই সংকটের সমাধানটা কি বা আদৌ কোনো সমাধান আছে কি না?
সামিনা লুৎফা: এই সংকটের সমাধান আসলে আমরা ব্যক্তিগতভাবে করতে পারবো না। কিন্তু আমরা ব্যক্তিগতভাবেই করছি। কারণ ধরেন, আমি যেটা বললাম যে ২৪/২৫ বছর ধরে আমি এটাতে অভ্যস্ত। মানে আমি এটাকে পাত্তা না দিতে শিখেছি। এখন এটা তো কোনো কাজের কথা না। এখানে কোনো না কোনো উপায় বের করতে হবে, যাতে এই যে সাইবার অ্যাটাকগুলো হয়, এগুলো কিন্তু কোনটাই এমন না যে, এর সংঘবদ্ধ চক্রকে চিহ্নিত করা সম্ভব না। এর জন্য আসলে অনেক বড়, মানে ক্ষমতার জায়গা থেকেই এটাকে দেখতে হবে। কারণ, আমরা বুঝতে পারছি যে, এই ধরনের সাইবার অ্যাটাকগুলো কোনো না কোনো ইন্টারেস্ট গ্রুপকে সার্ভ করে। তার ফলে কোথাও না কোথাও থেকে তারা টাকা পায়, যার ভিত্তিতে এই বট বা ফেইক একাউন্ট, এগুলো তৈরি হচ্ছে। বা এই যে ফেইক ফটোকার্ড বা ডিপ ফেইক, যেগুলো তৈরি হচ্ছে, এগুলো কিন্তু ভয়ঙ্কর প্রভাব রাখতে পারে বিশেষ করে নারীদের জীবনে। ভয়ঙ্কর প্রভাবটা যেন না থাকে, সেজন্য বেসিক্যালি সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে। কী করে এই সাইবার সিকিউরিটিটা, এটলিস্ট সেফটিটা নারীদের দেওয়া যায়। এবং এটার জন্য তাদের দরকার হলে যে প্লাটফর্মগুলো আছে, মেটা কিম্বা আরো যারা রয়েছে, তাদের সঙ্গে বসতে হবে, হাউ ডু উই ডু দিস ইন এ ব্যাটার…। তো, আমি জানি এটা, যেহেতু এটার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থও জড়িত, এটা খুব টাফ একটা জিনিস। এক্ষেত্রে আমি আরেকটা কাজ করছি ইদানিং, আমি বলছি সকলকে, আসলে আমাদের উচিত, যে সাইবার বুলিং বা হ্যারাসমেন্ট কীভাবে পাত্তা না দিতে হয়, সেটা শেখার জন্যও ওয়ার্কশপ করা যেতে পারে। তো সেগুলো আমরা আসলে নিজেরা কথা বলতে পারি এবং যেটা… এটা কিন্তু সত্যি যে এই চাপটা কিন্তু হয়। আপনি যতই পাত্তা না দেন, যতকিছুই বলেন না কেন, কোথাও না কোথাও এটা একটা চাপ হিসেবে আপনার কাছে থেকে যায়। তো, আমি যেটা ব্যক্তিগতভাবে করেছি সেটা হচ্ছে আমি কথা বলতে থেকেছি, ভিজিবল থেকেছি, আমার যা করার ছিল, যা থামাতে চাওয়া হয়েছে সেটা আমি থামাইনি। এখন এটা হচ্ছে একটা অন্যতম উপায় আমাদের মত এক্টিভিস্টদের, যাদের হাতে আর কিছুই নেই, তাদের কাছে আমাদের মূল অস্ত্র হচ্ছে যে, এই প্রতিরোধ বা কথা বলা, কথা বলাটা চালিয়ে যাওয়া, যাতে যা তারা বন্ধ করতে চায় সেটা বন্ধ না করা। এটাই হচ্ছে একমাত্র উপায় আমার কাছে মনে হয়, ব্যক্তিগতভাবে একটিভিস্টের পক্ষ থেকে। আসলে এই সাইবার সুরক্ষাটা দেওয়া কিন্তু রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। এটা কোনোভাবেই আমি জানিনা কেন এটা সম্ভব হচ্ছে না। এই সরকারের পক্ষে (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) কতদূর সম্ভব হবে এটা নিয়ে আমি খুব সন্দিহান। আমার মনে হয় না খুব একটা হবে। তবে আমার চাওয়া যে, এটা যেন একটা সলিউশনে আমরা আসতে পারি।
বীথি: কেন নারীবাদ লাগবে? এই জনপদের নারীদের কখনো নারীবাদী হতে হয়নি। তারপরে নারীরা কত সম্মানিত ছিল, নারীদের কত অবদান— এই ধরনের কথা আমরা শুনি। নারীবাদ আসলে কতটুকু পশ্চিমা বা যদি পশ্চিমা হয়ে থাকে তাহলে এই দেশের প্রেক্ষাপটে তাকে কীভাবে প্রাসঙ্গিক করে নারীবাদী আন্দোলন গড়ে তোলা যায় বলে আপনি মনে করেন? বা এই আন্দোলন আসলে কতটা জরুরি এই মুহূর্তে, এই পর্যায়ে এসে?
সামিনা লুৎফা: ধরেন, আমাদের বেঙ্গলের একটা খুব ঋদ্ধ ঐতিহ্যের জায়গা আছে। বেঙ্গল কিন্তু এমন একটা জায়গা, আপনি যদি একটু দেখেন, এটা ডেল্টা তো, এখানে আসলে কেউ সহজে আসতে চায়নি। সবসময় প্রান্তিক মানুষেরাই এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। কারণ, এখানকার এই মশা-মাছি, বন্যা এবং অন্যান্য, সাপ… ইত্যাদি, একটা কঠিন জায়গা আর কি। এখানে টিকে থাকা কঠিন। তো, এখানে সবসময় প্রান্তিক মানুষেরাই এসে থেকেছেন। এবং খেয়াল করে দেখেন যে, ডেইটিরা ম্যাক্সিমামই কিন্তু ফিমেল। এবং ডেইটিদেরও আগে যারা, তার মানে আমি যদি বলি যে, রিসেন্ট পাস্টে সনাতন ধর্মের যে সমস্ত, যাদেরকে তারা দেবী হিসেবে পূজা করছেন, সেখানে যেমন নারী খুব ইম্পর্টেন্ট ক্যারেক্টার, একইভাবে আমরা তার আগের দিক থেকে যদি দেখি, ঐতিহ্যগতভাবেই তো আমাদের অনেক শক্তিশালী নারীদের কথা আমরা জানি। যেমন, আমারই নাটক আছে, খনা। এখন এই যে ধরেন, আমি একেবারেই এটা একদম… মানে আমি এটা নিয়ে লিখেওছি। খনা চরিত্রটা আমাকে, ব্যক্তি সামিনা লুৎফাকে কিন্তু অনেক প্রভাবিত করেছে। কারণ, ধরেন ১৪শ বছর আগের একটা লিজেন্ড, এখন উনি তো সত্যিকারের একটা মানুষও না। উনি তো ছিলেনও না কোথাও। এখন, এই যে লিজেন্ড বা যে একটা কালেক্টিভ নলেজের স্ফুরণ, একটা ম্যানিফেস্টেশন, এই ম্যানিফেস্টেশন হিসেবেও যদি আমরা খনাকে দেখি, আমরা দেখছি যে, নারীকে কথা বলার জন্য তার জিভ কেটে দেওয়া হচ্ছে। তার মানে এই ম্যানিফেস্টেশনটা আমাদেরকে একটা কিছু শেখাতে চাচ্ছে। কী শিখাতে চাচ্ছে? আমরা যদি চিন্তা করি যে, হর্টিক্যালচার সোসাইটি থেকে এগ্রিকালচারে আসছিলাম এবং সেই সময় নারীর থেকে পুরুষ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তার মানে তার আগে পর্যন্ত কিন্তু আমাদের এই জনপদেও নারীরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। বিশেষ করে জীবিকার ক্ষেত্রে, কৃষির ক্ষেত্রে, যেহেতু হর্টিকালচার বা উদ্যানভিত্তিক কৃষি মূল কৃষির ধরন ছিল। তো, সেই নারীদের কাছ থেকে তাদের ক্ষমতাটা পুরুষের কাছে আসছে এবং পুরুষ তখন নারীকে বন্ধ করছে। তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এই যে হিস্টোরিক্যাল যে যাত্রাটা আছে সেখানে কিন্তু আমাদের শক্ত, খুবই নেতৃত্বদানকারী নারীদের চরিত্র আমাদের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এবং এখনো যদি আপনি কৃষকদের মধ্যে যান, দেখবেন যে খনার একটা মেজর রেলিভেন্স আছে এবং এই রেলিভেন্স থাকার কারণেই আমরা বুঝতে পারি যে, নারী শক্তি এই জনপদে বহু প্রাচীন এবং পুরাতন। সুতরাং সবসময় নারীদেরকে আটকে রাখার জন্য একটা বিশেষ প্রজেক্ট নিতে হয়। তো, এই প্রজেক্টটা এখন হয়ে উঠেছে যে, নারীবাদ হচ্ছে একটা ওয়েস্টার্ন ব্যাপার। আমার কাছে নারীবাদ, অন্তত বেঙ্গলে কখনো এটা ওয়েস্টার্ন বলে মনে হয়নি। বেঙ্গলের নারীরা সবসময় খুবই শক্তিশালী চরিত্র নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। কারণ, বেঙ্গলে এমনিতেই প্রান্তিক মানুষের বসবাস এবং সে প্রান্তিকদের মধ্যে প্রান্তিকতম হচ্ছেন নারীরা এবং খেয়াল করলে দেখবেন যে, কৃষির প্রায় ৮০ ভাগ কাজ নারীরা করলেও তারা নিজেদেরকে কৃষক হিসেবে স্বীকার করেন না, নিজেরাও করেন না। একাধিক কৃষিবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে যে, নারীরা নিজেদেরকে সহায়ক বলে দাবি করেন এবং তারা নিজেদেরকে দাবিই করেন না যে তারা কৃষক। অথচ কৃষির ৮০ ভাগ কাজ ওনারা করছেন এবং এটা বিভিন্ন রকম কৃষিজীবী কমিউনিটির মধ্যে রিসার্চে দেখা গেছে।
তো, এই যে এক ধরনের… এক তো আছে যে, এনজিওর মাধ্যমে বাহিত হয়ে উইমেনস এম্পাওয়ারমেন্টের যে ধারণা কিংবা ক্লাইমেট চেঞ্জের এডাপ্টেশনে মেয়েদেরকে ব্যবহার করার যে ধারণা, এই ধারণাটাকে ওয়েস্টার্ন বলে চিহ্নিত করার কারণ আছে এবং যৌক্তিকতাও আছে। কিন্তু এই ধারণা ছাড়া তো এই বেঙ্গলের নারীর নিজস্ব শক্তির, নিজস্ব লড়াইয়ের বহু ইতিহাস আছে। আপনি দেখেন, টঙ্ক বিদ্রোহের দিকে তাকান, আপনি সেখানে কিন্তু নারীদের পাচ্ছেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। এই যে, বিভিন্ন সময় তেভাগায় নারীদের ভূমিকা, বিভিন্ন সময় আন্দোলনে সংগ্রামে নারীরা যে শক্ত ভূমিকা রেখেছেন, সেই ভূমিকাকেও যদি আমরা একটু ট্রেস করি তাহলে আমরা দেখতে পাবো যে বেঙ্গলের নিজস্ব নারীবাদী ধারণা রয়েছে। কিন্তু নিজস্ব নারীবাদী ধারণা আছে বলেই যে আমরা ওয়েস্টকে বাদ দিয়ে দেবো এমনও কিন্তু না। কারণ, আমরা তো আসলে এই পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সমাজ না। আমরা কিন্তু গ্লোবালি কানেক্টেড এবং সেখানে গ্লোবাল কিছু বেসিক মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড আমাদেরকে কিন্তু ফলো করতে হয়। না হলে কিন্তু সেটারও এক ধরনের প্রতিক্রিয়া কিন্তু দেখা যেতে পারে। সো, যেখানে আমরা এগিয়ে গিয়েছিলাম, যেগুলো আমরা (আমাদের) বেসিক স্ট্যান্ডার্ড, আমরা টিক চিহ্ন দিয়েছিলাম, সেখান থেকে আমরা পিছিয়ে যাবো কেন? এবং সে পিছিয়ে যাবো যাবো কেন— এটা বলার জন্য যদি আমাকে কেউ ওয়েস্টার্ন নারীবাদী বলেন, বলুক। আমার কিছু আসে যায় না। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, যখন অধিকারের প্রশ্ন, যখন এটা মানুষের মানবিক অধিকারের, সমান মর্যাদার প্রশ্ন, তখন এটা ওয়েস্টার্ন না চাঁদ থেকে আসছে ইটস নট ইম্পর্টেন্ট। হোয়াট ইজ ইম্পর্টেন্ট ইজ, আমি মানুষ হিসেবে ভিন্ন আইডেন্টিটির বা ভিন্ন পরিচয়ের হওয়ার কারণে আমাকে কোনো জায়গা থেকে আটকে রাখা হচ্ছে কি না, বৈষম্য করা হচ্ছে কি না। তাহলে এই বৈষম্য যদি আমি বিলোপ চাই, তাহলে তো পুরো আইডিয়াটাই ওয়েস্টার্ন। তাহলে সেই ওয়েস্টার্ন আইডিয়া নিয়ে চলতে পারলে আমরা নারীর বিষয়ে কেন এই একই কথা বলতে পারছি না।
বীথি: আপনার কাছে আমার একটি বিশেষ প্রশ্ন— দেশে এই মুহূর্তে নারীবাদ ছাড়া আর পশ্চিমা কোনো সংস্কৃতি বা পশ্চিমা আর কোনো কিছু আছে কি না?
সামিনা লুৎফা: অবশ্যই সংখ্যাগরিষ্ঠের যে ধর্ম সেটাও তো পশ্চিম থেকেই এসেছে। এখন সেটা কতদূর পশ্চিম, কোনটা পশ্চিম আর কোনটা পশ্চিম না সেগুলো নিয়ে নিশ্চয়ই তর্ক-বিতর্ক করা যেতে পারে।
বীথি: আপনার চুপ থাকা মানে কি আপনি যখন শুধুমাত্র সুস্থ নেই তখনই আপনি চুপ থাকেন। এছাড়া আপনি যতক্ষণ সজ্ঞানে থাকেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার শরীরে শক্তি থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি মাঠে থাকেন। কখনো কি ক্লান্ত লাগে আপনার?
সামিনা লুৎফা: হ্যাঁ, ক্লান্ত লাগে। বিশেষ করে ক্লান্ত লাগে হচ্ছে, ইদানিং বেশি লাগছে, কারণ মনে হচ্ছে যে, আমরা একই জঞ্জাল খালি সরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি, সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এবং একটা ভয় আছে অনেক মানুষের। যেহেতু তারা হয়তো কখনো ওই রেজিমের সাপোর্ট ছিলেন তারপর তারা কথা বলতে চান না, এরকম অনেক কিছু হতে পারে। এমন কি আমরা যাদেরকে ভাবতাম যে, যারা অন্তত মানবাধিকারের প্রশ্নে বা গণতন্ত্র এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে আমাদের সাথে একমত হবেন বলে ভাবতাম, তারা আসলে দেখি যে, একমত হন না। কেউ কেউ আছেন এই জুলাইয়ের পুরো হত্যাকাণ্ডকে অস্বীকার করেন, তাদের সাথে কথা বলতে পারা যায় না, ইত্যাদি ইত্যাদি, এগুলোর কারণে ক্লান্ত লাগে বটে। তবে এটাও সত্যি যে, আমি আসলে এই মুহূর্তে যতটুকু বলতে চাই, সব সময় যে পারি তা না।
আপনি যেটা বলছেন যে, আমি শুধু অসুস্থ থাকি, তাই না। আমাদের বিভাগে প্রচন্ড চাপ আছে। মানে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচাইতে বড় বিভাগ সবচেয়ে কম শিক্ষক নিয়ে আমরা চালাচ্ছি। তার ফলে খাতা দেখা, ক্লাস, পরীক্ষা, অস্থির অবস্থা। সেটার কারণে অনেক সময় ফেসবুকে আমি ঢুকতে পারি না। অনেক কিছুতে একটু দেরি হয়ে যায়। এটা অনিচ্ছাকৃত; আসলে ইচ্ছাকৃত। কারণ, আসলে আমার তো ওইটা আগের কাজ। ওটা শেষ না করে করাটা অনুচিত হয়, আরকি। সেজন্য ওইটা একটা চাপ থাকে। কারণ আগের তুলনায় অসম্ভব বেশি চাপে আছি আমরা। কারণ আমাদের বিভাগে ছয় জন শিক্ষককে বয়কট করেছে শিক্ষার্থীরা, এই জুলাইয়ের ভূমিকার কারণে। আবার অনেকে পদ-পদবী পেয়ে বাইরে চলে গেছেন। সুতরাং এই সমস্ত ঘটনার কারণে সবচাইতে বেশি চাপে থাকা বিভাগ হচ্ছে সমাজবিজ্ঞান। এখানে যেমন নেতা বেশি, সব দলেরই নেতা বেশি। সে কারণে আমাদের বিপদও অনেক বেশি। ছাত্রও বেশি। সব মিলে আমরা একটু… ওই কারণেও হতে পারে, অনেক সময়, তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখানো সম্ভব হচ্ছে না ইদানিং।
বীথি: খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন আপনাকে অনলাইনে-অফলাইনে কেউ পাচ্ছে না, তখন কি নানান ধরনের ট্যাগিং করা হয় বা তখন কি ভুল বোঝার কোনো সুযোগ কখনো তৈরি হয়েছে?
সামিনা লুৎফা: হ্যঁ, হয় তো। ইউনিভার্সিটি টিচারর্স নেটওয়ার্ক গ্রুপে এসেছে কথাটা। আমাদেরকে বারবার বলা হচ্ছে, আমরা নাকি ক্ষমতায় চলে গেছি, ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে আমরা এখন আর সবকিছু নিয়ে কথা বলি না। কিন্তু ধরেন, একটা বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার জন্য তো আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হয়। আসলে আমাদের একটা খুব ভ্যারিড নেটওয়ার্ক সারা বাংলাদেশে বিস্তৃত। সকলে কিন্তু আমাদের মত ব্যস্ত তাদের নিজেদের প্রফেশনাল লাইফ নিয়ে। সুতরাং জুলাইয়ে যে রকম সব বন্ধ ছিল, এখন তো আর বন্ধ না, সব খোলা। সবাইকে সব সময় পাওয়া যায় না এবং সকলের মতামত ছাড়া আমরা কাজ করতে পারি না। একটা ডেমোক্রেটিক ওয়েতে আমাদের করতে হয়, আমাদের একটা বিবৃতি ড্রাফট করতে হয়, সেটা সবার মতামতের জন্য রাখতে হয়, তারপরে আমরা সেটা দিতে পারি। সো, সেই কারণে দেরি হয় এবং সেই দেরি হওয়াটাকেও খুবই ট্যাগ করা হয়। বলা হচ্ছে, আমরা ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে এখন আর এরকম বলছি না। এটা সত্যি না। এবং আমরা দেখেছি যে ৫ আগস্ট থেকে আমরা প্রেস কনফারেন্স করে যাচ্ছি। ৫ ই আগস্ট প্রেস কনফারেন্স করেছি। ৬ আগস্ট সম্ভবত আমরা একটা মিছিল এবং সমাবেশ করেছিলাম ভাঙচুরের বিরুদ্ধে। মানে ৮ আগস্ট, ১০ আগস্ট, মানে প্রতি আগস্ট মাসেই মনে হয় আমাদের চার পাঁচটা ইভেন্ট আছে, যেগুলো আমরা করেছি। বিবৃতি দিয়েছি, আগস্ট-সেপ্টেম্বরে অন্তত ১০-১২ টা। বিভিন্ন জায়গায় এই সমস্ত হামলা, ভাঙচুর এগুলোর বিরুদ্ধে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য, নানান কারণে। এবং আমি আজকে আসার আগে খেয়াল করছিলাম যে, এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, আমরা ৫ আগস্ট থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত কতগুলো বিবৃতি দিয়েছি, কতগুলো ইভেন্ট করেছি, মানে প্রতিবাদ ইভেন্ট করেছি, সেগুলোর একটা লিস্ট করে আমরা ফেসবুকে দেবো ভাবছি। মানুষ যখন দেখতে চায় না, তখন এরকমই হয়। আমরা যে এত সরব আছি, তারপরও তারা দেখতে চায় না। কারণ তাদের মতো করে বলছি না তো। তাদের মতো করে না বললেই তারা ট্যাগ দিতে থাকেন। এখন আমরা তো আমাদের মতোই বলবো। আগেও যেরকম বলেছি, এখনো সেরকম বলবো। এটাই আমাদের পজিশন।
বীথি: আপনার কাছে আমি শেষ প্রশ্ন করতে চাই। আপনি একজন সমাজবিজ্ঞানী। সেখান থেকে জানতে চাই যে, বাংলাদেশের সামাজিক যে পরিস্থিতি এখন বিরাজ করছে, সেটাকে আপনি কীভাবে দেখেন এবং যদি মনে করেন এই সামাজিক পরিস্থিতি পাল্টানো প্রয়োজন নেই বা কখনো পাল্টাবে না, সেক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কী নিয়ে অপেক্ষা করছে?
সামিনা লুৎফা: আমি একটা জিনিস মনে করি যে, বাংলাদেশে আমরা… জুলাই অভ্যুত্থানের শেষদিকে, আমাদের জুলাই প্রজন্ম যে কথাগুলো লিখছিল রাস্তায়, মেট্রোরেলের পিলারের মধ্যে, সেগুলো আসলে বাংলাদেশের অন্তরের কথা। এবং এগুলো কেউ শিখিয়ে দিয়েছিল বলে লিখছিলো, অমুক মাস্টারমাইন্ড বলে দিয়েছিলো বলে লিখছিলো কিংবা অমুক ছাত্র সংগঠনের সদস্য বলে লিখছিলো, এগুলো আমি বিশ্বাস করি না। আমার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষের নিজস্ব একটা আত্মা আছে এবং সেই আত্মার মধ্যে এক ধরনের সহমর্মিতা, সহিষ্ণুতা, এগুলো সবসময় ছিলো। যেটা এসেছে, পশ্চিম থেকেই এসেছে। সেটা যেরকম রেমিটেন্স, সেই রেমিটেন্সের সাথে সাথে কিছু মূল্যবোধও এসেছে। এবং এই মূল্যবোধের জায়গায় অসহিষ্ণুতার জায়গাটা অনেক বেড়ে গেছে। এবং এই অসহিষ্ণুতা আসলে আমাদের নয়, আমাদেরটা হচ্ছে সহিষ্ণুতা। আমাদেরটা হচ্ছে সহাবস্থান, মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান। এই জায়গাটা আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশের সাইলেন্ট মেজরিটি ওইখানে। এবং আমরা জানি যে, তরুণ প্রজন্মে একটা মেজর অংশ আছে। এবং এই তরুণ প্রজন্ম সকলে কিন্তু এনসিপি বা শিবির বা ছাত্রদলের রাজনীতি করছে না। তারা কিন্তু অনেকেই আছে যারা কিছুই বলছে না, পড়ালেখা করছে, তাদের ক্যারিয়ার রেডি করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই তরুণ প্রজন্ম, যেই ধরনের বাংলাদেশ, যে ধরনের সহবস্থানের বাংলাদেশ আমাদেরকে জুলাইয়ের শেষ দিকে দেখিয়েছে, সেই তরুণরা এই সমাজে আছে বলে আমি মনে করি এবং সেই তরুণরা এই সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন করতে সক্ষম, যদি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এবং আমাদের এখন যারা সরকারে আছেন তারা যদি আরেকটু দায়িত্বশীল আচরণ করেন। কিন্তু, তারা যদি দায়িত্বশীল আচরণ নাও করেন, এরা যে নাই হয়ে যাবে, তা তো না। কিন্তু আমি মনে করি, এদের মধ্যে ফ্রাস্ট্রেশন আসতে পারে, এরা হতোদ্যম হয়ে যেতে পারেন। সেইখানে আমি সবসময় মনে করি যে, আমাদের বলতে থাকা প্রয়োজন, আমাদের সাংবাদিকদের, আমাদের শিক্ষকদের, আমাদের নাগরিকদের সবসময় বলতে থাকা প্রয়োজন— আমরা টের পাই, এই বাংলাদেশের নারীর যে মূল স্পন্দন, সেটা হচ্ছে সহাবস্থানের, সেটা হচ্ছে মর্যাদার, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার। এবং এই জায়গাটা টিকে থাকবে বলেই আমি মনে করি। এবং সমাজ পরিবর্তন একদিনে হয় না। বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটার মত কিছু আসেনি। কিন্তু সমাজ ধীরে ধীরেই সবসময় পরিবর্তন হতে থাকে। আমি যেটা একটু আগে বলেছি। সেই পরিবর্তন কিন্তু গ্লোবালিও কানেক্টেড। সো, আমরা যদি ভাবি যে, আমরা একা একা এটা করে ফেলবো, ওটা করে ফেলবো, ব্যাপারটা কিন্তু এত সহজ না। এটার একটা গ্লোবাল ইমপ্লিকেশন আছে এবং গ্লোবাল একটা ইমপ্যাক্টও আছে আমাদের উপরে। সেগুলো চিন্তা করে আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশের তরুণরা অনেক কিছু করতে পারেন এবং তারা পজিটিভলি বাংলাদেশকে চেঞ্জ করতে পারেন, যদি তারা চান। তাদেরকে ওই জায়গায় মোটিভেটেড রাখাটাই আমাদের মত সিনিয়ারদের দায়িত্ব।
বীথি: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য, এবং আপনার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক এবং সামাজিক যে কাজগুলো করেন, সেগুলো নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য।●