শিল্প জ্বি হুজুর করবে না, শিল্পের কাজ প্রশ্ন তোলা : আশফাক নিপুন
নির্মাতা আশফাক নিপুন মুখোমুখি হয়েছিলেন নেত্র নিউজের। কথা বলেছেন, সিনেমা ও সিনেমার রাজনীতি নিয়ে। কথাপ্রসঙ্গে উঠে এসেছে কর্তৃত্ববাদী হাসিনা সরকারের সময়কার নির্মাণের নানা চ্যালেঞ্জের বিষয়-আশয়ও। তার সঙ্গে ছিলেন নেত্র নিউজের সুরাইয়া সুলতানা (বীথি)।
বীথি: আপনাকে আমরা দেখেছি বিগত বছরগুলোতে, সম্ভবত একমাত্র নির্মাতা, যিনি একের পর এক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বলপূর্বক অন্তর্ধানসহ সমাজের এবং রাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের ঘটনায় একদম সরব একটা মানুষ হিসেবে। আপনার কি কখনো মনে হয়েছে যে, আপনার এই অ্যাক্টিভিজম এবং শিল্পসত্তা, দুটোকে ব্যালেন্স করতে হয়েছে?
নিপুন: ব্যালেন্স আমাকে তখনই করতে হতো, যদি আমি ডেলিভারেটলি কিছু করতে চাইতাম, তাহলে। ধরেন, আমি চিন্তা করে দেখলাম যে, আচ্ছা, এখন মেবি হয়তো বলপূর্বক অন্তর্ধান, যেটাকে আমরা বলি যে গুম হওয়া বা ধরেন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং অথবা যেকোনো কিছু… গণপিটুনি নিয়ে আমি কাজ করেছি, আরো অনেক কিছু নিয়ে কাজ করেছি, এগুলো ভেরি ট্রেন্ডিং টপিক। সো লেট্স মেক সামথিং আউট অফ ইট, তাহলে হয়তো আমাকে ব্যালেন্স করার একটা ব্যাপার থাকতো। আমার কাছে মনে হয় কি, আমার যে নির্মাণ প্রক্রিয়া, সেটা খুবই অর্গানিক। আমি আগে থেকে স্ক্রিপ্ট লিখে সেটে যাই না। এক ধরনের আইডিয়া মাথায় থাকে, এন্ড দ্যান সেটে গিয়ে করি। সো, নির্মাতা হিসেবে বা রাইটার হিসেবে যে বিষয়গুলো আমাকে ডিস্টার্ব করে, আলোড়িত করে, ইন এ ভেরি নেগেটিভ ওয়ে, আমি পজিটিভ ওয়েতে বলছি না। বিকজ এই ঘটনাগুলো কোনোটাই আসলে পজিটিভ কোনো ঘটনা না সমাজের মধ্যে। সো, তখনই আমার মনে হয় যে, আমার কাজের মধ্যে সেটা অটোমেটিক্যালি সাবজেক্ট হিসেবে চলেই আসে। এটা এমন না যে, আমি ঠিক করি যে, আচ্ছা এই একটা বিষয় নিয়ে আমাকে এখন কাজ করতে হবে, সেটা না। কিন্তু হ্যাঁ, অবভিয়াসলি যেহেতু আমি একজন ভেরি সোশ্যালি অ্যাওয়ার, পলিটিক্যালি অ্যাওয়ার একজন মানুষ বলে নিজেকে মনে করি এবং নির্মাতা বলেও মনে করি, সেটার একটা ছাপ আমার কাজের মধ্যে থাকে। ব্যালেন্স করার যে ব্যাপারটা বলছেন, একটা জায়গায় আমাকে মাথায় রাখতে হয়, যখন আমি আসলে নির্মাণ করি, সেটা হচ্ছে আমার গল্পটা… বিকজ আমি তো দিন শেষে ফিকশনই বানাচ্ছি বা আমি দিন শেষে হয়তো একটা সিরিজ বানাচ্ছি, গল্পই বলছি। গল্পটা যেন অ্যাক্টিভিজম না হয়ে ওঠে। মানে, গল্পের একটা নিজস্ব চরিত্র থাকে, এটাকে গল্পই থাকতে হবে। যদি কোনো কারণে অ্যাক্টিভিজম গল্পটাকে ছাপিয়ে চলে আসে তখন সেটা গল্পের প্রতি আসলে সুবিচার করা হয় না। সেটা যেকোনো সাবজেক্ট নিয়ে। এই ব্যাপারে খুব বেশি কেয়ারফুল থাকতে হয়। না হলে পুরো বিষয়টাকে প্রপাগান্ডা মনে হতে পারে। এটা ছাড়া…
বীথি: কিন্তু এই গল্পগুলো বলতে গিয়ে আপনার কি মনে হচ্ছে যে, আপনি স্বাধীনভাবে গল্পগুলো বলতে পারছেন বা কতটুকু স্বাধীনতা নির্মাতা হিসেবে আশফাক নিপুনের ছিল?
নিপুন: এই কাজগুলো নিয়ে বা এই কথাগুলো নিয়ে ওপেনলি বলার মতো সিচুয়েশন তো ডেফিনেটলি ছিল না। মানে, আমি নির্মাণের জায়গা বাদই দিলাম। আপনি ফেসবুকে ওপেনলি লিখতে পারতেন না। আপনাকে অনেক ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে লিখতে হতো। যেন সরাসরি প্রশ্ন ওভাবে না যায়। যদি আপনি দেশে থেকে কাজ করতে চান, তাহলে। সো অবভিয়াসলি এক ধরনের বাধা তো ছিল। কিন্তু আমার কাছে… এটা খুবই অদ্ভুত শোনাবে যে, আমি পার্সোনালি যেটা বিশ্বাস করি, সেটা হচ্ছে শিল্পের গ্রোথ হয় আসলে যখন কোনো রকমের স্বাধীনতা থাকে না, তখন। একজন শিল্পীর জন্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ চারণভূমি হচ্ছে, যেখানে অপ্রেশন থাকে। যদিও কথাটা ভেরি কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট শোনায়। কারণ, নাগরিক হিসেবে আমি চাই যে, আসলে একটা সুস্থ সমাজ হোক অথবা আমি যদি বলি যে, একটা নিয়মের রাষ্ট্র হোক। কিন্তু যদি শিল্পী হিসেবে… শুধু এখনকার কথা বলছি না, আপনি পৃথিবীর ইতিহাস দেখেন, সবচেয়ে গ্রেট আর্টগুলো তৈরি হয়েছে আসলে সাপ্রেশনের সময়, অপ্রেশনের সময়। কারণ, তখনই আসলে একজন শিল্পী নানান ভাষায় কথা বলতে পারে। সবচেয়ে ভালো কার্টুনগুলো আঁকা হয়েছে যখন নিপীড়ন চলছিল। সবচেয়ে ভালো গল্প, কবিতা, সিনেমা নির্মিত হয়েছে আসলে যখন অপ্রেরশন চলছিল বা আমি যেটাকে বলি যে, নিপীড়ন চলছিল। সো, অবভিয়াসলি স্বাধীনতা তো ছিলই না। কিন্তু আরেক দিক দিয়ে আমার নিজের ক্রিয়েটিভ স্বাধীনতার চর্চার সম্ভাবনাটা তখন অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ধরেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুম নিয়ে বা সমাজের, রাষ্ট্রের যে কোনো অনাচার নিয়ে, আমি ডিরেক্টলি কোনো গল্প বললাম, একদম ডিরেক্ট, এড্রেস করে, তখন কিন্তু দর্শককে ভাবতে হয় না। দর্শক কিন্তু তখন অনেকটা ডকুমেন্টারির মতো দেখতে পারে। কিন্তু যখন আসলে আমি (আমাকে) সোজা রাস্তায় না গিয়ে, একটু পেঁচানো রাস্তা দিয়ে গল্পটা বলতে হচ্ছে, বিকজ আমার স্বাধীনতা নাই, দর্শকেরও তখন এক ধরনের মেধার চর্চা হয়। সে তখন ডিসকভার করে, আচ্ছা, এটা হচ্ছে ওই ঘটনা! আচ্ছা, এটা হচ্ছে এই ব্যাপারটাকে এড্রেস করা! সো, আমার মনে হয় কি, এই ব্যাপারটা দর্শক এবং নির্মাতা দুইজনের জন্য এক ধরনের মেধার চর্চার সম্মিলন ঘটে, আর কি।
বীথি: মহানগর যখন আপনি বানান, তখন আপনার মাথায় কোন চরিত্রগুলো ছিল বা পার্টিকুলার কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে মহানগর বানিয়েছেন কি না?
নিপুন: একটা পুলিশি রাষ্ট্র হওয়া; মানে, একদম পুলিশদ্বারা শাসিত, সেটা রাজনৈতিক দল হোক, সাধারণ মানুষ হোক, এটা হয়েছিল মোস্ট প্রোবাবলি ২০১৭-১৮ এর পরে, একদম আর কোনো রাখ-ঢাক নাই, আসলে পুলিশ তখন যা ইচ্ছা তাই করতে পারে, ওই সময়টাতে। তো, তখন পুলিশের যে ভূমিকা, সেটা নিয়ে তো প্রচুর লেখালেখি হচ্ছিল। মানে পত্রিকায় যেসব রিপোর্ট পড়ছিলাম আমরা বা দেখছিলাম, সেটা এক ধরনের ইয়ে (প্ররোচনা) ছিল… তো আমার মহানগরের আইডিয়াটা এসেছিল ওখান থেকেই।
একদম যদি বেসিক আইডিয়া বলি… আমার একটা ব্যক্তিগত দর্শন হচ্ছে যে, বাঙালি দুটো জায়গায় যেতে খুব আন-কমফোর্ট ফিল করে বা ভয় পায়। এটা আমার ব্যক্তিগত অবজারভেশন— একটা হচ্ছে ফাইভস্টার হোটেল, আরেকটা হচ্ছে থানা। এই দুটো জায়গাতে যখনই কোনো বাঙালিকে, মানে কোনো বাংলাদেশি বা কোনো দেশের মানুষকে বলা হয় যেতে, তখন সে খুব কনশাস হয়ে যায়। ফাইভস্টার হোটেল হলে কনশাস হয়ে যায়— কী পড়ে যাবে, কীভাবে যাবে, ওখানে কীভাবে কথা বলবে বা ধরেন তার যদি কোনো প্রাইভেট গাড়ি না থাকে তাহলে গাড়িটা দূরে পার্ক করে এসে তারপরে হেঁটে হেঁটে ঢুকবে; এইসব প্ল্যানগুলো নরমালি বাঙালি মধ্যবিত্তরা করে থাকেন। আর থানার ব্যাপারে এক ধরনের ভয় কাজ করে। এই ভয়টাকে পুঁজি করেই তো আসলে পুলিশের অপ্রেশনগুলো চলছিল। তো, আমার মনে হচ্ছিল যে, কোনো একজনকে যদি থানায় পুলিশ নিয়ে যায়, এরপরে কিন্তু আমরা কী হয় সেটা জানি না। এটা কিন্তু কোনো পেপারে আসে না। কাউকে ধরে নিয়ে গেল, এরপরে কী হলো, এটা আমরা জানি না।
আমার তখন মনে হচ্ছিল দিস কুড বি এ ফ্যান্টাস্টিক আইডিয়া যে, একটা সাধারণ লোককে যদি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়, এন্ড থানার মধ্যে ২৪ ঘণ্টা কী চলতে পারে, কী হতে পারে, তার মনস্তত্ত্ব কী হতে পারে, কীভাবে সে এখান থেকে মুক্তি পেতে পারে, আবার পুলিশ তাকে নিয়ে কীভাবে খেলতে পারে, এইটা নিয়ে আমার মনে হচ্ছিল দিস কুড বি এ ফ্যান্টাস্টিক টপিক। এবং সেটা যদি এক রাতের মধ্যে হয়!
এটার পেছনে আরেকটা রিজন আছে। আমাকে প্রায় সময়… এখন অবশ্য খুব কম হয় এটা, এক সময় আমাকে পুলিশ প্রায় রাস্তায় থামাতো। আমি যখন বাসায় ফিরতাম কাজ শেষ করে বা দাওয়াত থেকে। চেকপোস্ট হয় না? চেকপোস্টে আমাকে পুলিশ প্রায় থামাতো। থামাতে থামাতে… আমি সেইম রুট দিয়ে যেহেতু যাই, বাসায় ফিরি, পুলিশ থামায় এবং পরিচিত পুলিশজন। তো, আমি একবার বলেছিলাম যে… এবং প্রতিবার আমাকে নামতে হতো… আমি বাধ্যতামূলক ছাত্রের মতই নামতাম। নেমে ব্যাগ-ট্যাগ খুলে দেখাতাম। একবার মনে হয় আমি একটু মজা করে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, আপনারা তো আমাকে চেনেন, আমাকে তো প্রতিদিন নামান, কিছু তো পান না। তারপরও কেন নামান? আমি তো কোনোদিন পেপারে পড়িনাই যে, রাস্তায় যে পুলিশ থাকে, ওরা আসলে বিশাল কিছু উদ্ধার করে ফেলছে, মানে ধরেন, অস্ত্র-শস্ত্র বা মাদক, এগুলো তো উদ্ধার… বেসিক্যালি পয়েন্টটা কি, আপনারা থামান কেন?
এই কথাটা কেন বললাম সেজন্য আমাকে ওখানে আটকে রেখেছিল প্রায় অলমোস্ট ৪০ মিনিট থেকে এক ঘন্টা। আমাকে বলা হচ্ছিল যে, আপনাকে থানায় যেতে হবে আমাদের সাথে। আমি ভয় পেয়েছিলাম, সত্যি কথা। কারণ তখন রাত বাজে সাড়ে বারোটা, একটা। আমি তখন চিন্তা করছিলাম যে, আমি এখন যদি ফোন দেই কাউকে, কে ফোন ধরবে? আমি জানি না কেউ ফোন ধরবে কি না। আর রাতের ব্যাপারটা হচ্ছে কি, ধরেন, দিনের বেলা যদি কোনো পুলিশ আমাকে বলে যে, থানায় আসেন, মানুষের ভয় লাগে না। দিনের বেলা রাস্তাঘাটে মানুষজন থাকে, দিনের আলো থাকে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে যদি বলে যে, থানায় আসেন, তখন অবভিয়াসলি মানুষের একটা ভয় কাজ করে যে, নিয়ে যাচ্ছে, কী হবে! আমাকে ছাড়াতে কি কেউ আসবে কি না, আমি কি কাউকে পাবো কি না, কারো তো জানা দরকার। আমার মনে হলো, দিস কুড বি এ ফ্যান্টাস্টিক আইডিয়া, যদি এটা নিয়ে আমি কাজ করি। মহানগরের প্রিমাইস কিন্তু ওটার উপরে দাঁড় করা।
বীথি: আপনি এই যে একটা চরিত্র বানালেন, ওসি হারুন, এবং আমাদেরও একজন হারুন ছিল, আপনি আসলে এইটা কীভাবে করলেন? এবং এজন্য আপনাকে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে কি না?
নিপুন: অবভিয়াসলি হয়েছে। বিকজ, আমি…
বীথি: কিন্তু তার আগে চরিত্রটা কীভাবে বানালেন সেটা জানতে চাই। কেন ওসি হারুন? কেন অন্য কেউ না?
নিপুন: যখন আমি মহানগর বানিয়েছিলাম, এরপর তো আমাকে নানান ধরনের পুলিশের হয়রানির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। আমি ভেরি সারপ্রাইজিংলি খেয়াল করলাম যে, এখন থেকে চার বছর আগে আমার মেমোরিজে আসছে যে, ঠিক আজকের দিনটাই, যেদিন আসলে এইটা প্রচার হচ্ছে (মূলত রেকর্ড হচ্ছে) আজকের দিনটাতেই আমাকে প্রথম এস বি অফিসে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এটা আমার ফেসবুক মেমোরিজে এসেছে। চার বছর আগের। আর কো-ইন্সিডেন্টালি আপনি আজকে এই প্রশ্নটা করছেন যে, এটার জন্য কি কোনো প্রবলেম ফেস করতে হয়েছে কি না?
আমার কাছে মনে হয় হারুন নামটা ইজ এ ভেরি কমন বাংলাদেশি নাম। আপনি প্রতি পাঁচজন থেকে ছয় জনের মধ্যে একজন করে হারুন পাবেন। এই উত্তরটা আমি উনাদেরকে দিয়েছিলাম। যখন আমাকে জিজ্ঞেস…
বীথি: কিন্তু এর মধ্যে কোনো ষড়যন্ত্র ছিলো না, তাই তো?
নিপুন: ষড়যন্ত্র যদি আসলে বলেই দিই তাহলে তো আর ষড়যন্ত্র থাকে না। বাট আমার মনে হয় যে আসলে নামটাও… ডেফিনেটলি ইট ওয়ার্ক। কারণ আমি যে ক্যারেক্টারটা তৈরি করেছিলাম, ধূর্ত, ধুরন্ধর… তো আমি অন্য কোনো… মানে নামটা না… যে কোনো চরিত্রের নাম কিন্তু ইজ ভেরি ইম্পর্টেন্ট। ধরেন, আমি যদি পুলিশের ক্যারেক্টারটার নাম রাখতাম, ধরেন ওসি শহীদ অথবা ধরেন ওসি জসিম, তাহলে আমার মনে হয় এই ইম্প্যাক্টটা হয়তো পড়তো না, যতটা আসলে ওসি হারুন হওয়াতে মানুষের মুখে মুখে নামটা চলে আসছে। তো, এই কারণেই হয়তো… বাই দা ওয়ে, আমি যখন নামটা রেখেছিলাম এবং শুটিং করছিলাম তখন আমার অ্যাক্টররা আমাকে বলছিলেন যে, আপনি নামটা চেঞ্জ করেন, বিকজ, যেহেতু বাস্তবে একজন পুলিশ কর্মকর্তা আছেন। উনি কিন্তু তখনো ডিবির হেড ছিলেন না। হি ওয়াজ এন এসপি, জয়েন্ট কমিশনার হয়ে ছিলেন তেজগাঁও থানার। তো বললেন, যেহেতু একজন আছেনই, তাহলে কেন শুধু শুধু নামটা ইউজ করবো? আর আমার কথা হচ্ছে, ভাই দিস ইজ এ নেইম! আমি তো ফিকশনে যে কোনো কিছুই ইউজ করতে পারি। তো হোয়াই নট, দেখি, কী হয়।
বীথি: আপনি সব সময় যে ইস্যুগুলোকে সামনে আনেন বা যে টপিকে কাজ করেন, খুবই বৈচিত্র্যময় এই টপিকগুলো। তার মধ্যে আমরা যদি সাবরিনার কথা বলি, সাবরিনা একজন আত্মপ্রত্যয়ী নারী এবং নারীর একদম ক্ষমতায়নের জায়গাটা থেকে আপনি দেখানোর চেষ্টা করেন। আমরা দেখি যে, গত কয়েকদিন আগে মাত্র নারী সংস্কার কমিশনের একটা প্রতিবেদন নিয়ে যে ধরনের হইচই আমরা দেখলাম, নানা মহলের প্রতিক্রিয়া দেখলাম এবং যে ধরনের গালিগালাজ পর্যন্ত সহ্য করতে হলো নারীদের বা নারী সংস্কার কমিশনের সদস্যদের; আপনি যখন নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করলেন, আপনি কী ধরনের প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন?
নিপুন: আমি যখন একটা মহানগর বানাই তখন আমি যে ধরনের দর্শকের সাড়া পাই বা যে ধরনের দর্শক দেখতে বসেন, যখনই আমি নারীকেন্দ্রিক কোনো চরিত্রের গল্প করি তখন অবভিয়াসলি সেই ধরনের…(দর্শক দেখতে বসেন না) কারণ, এটা আমাদের দেশের ফেনোমেনা বলবো না, এটা মে বি, হয়তো, গ্লোবালি ওই সেইম ফেনোমেনাটা আছে। একটা টম ক্রুজের ছবি যখন আসে, আবার একটা জুলিয়া রবার্টসের ছবি যখন আসে, একদম জুলিয়া রবার্টসকে কেন্দ্র করে, তখন সেটা অডিয়েন্স টম ক্রুজের দর্শকের অর্ধেক হয়ে যায়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম না। বাংলাদেশে ডেফিনেটলি এটা হয় কিন্তু আমার কাছে মনে হয় কি যে, আমি যদি আসলে এটা চিন্তা করা শুরু করি যে, আচ্ছা নারীকেন্দ্রিক চরিত্র নিয়ে যদি কোনো গল্প করি, তাহলে দর্শক কমে যাবে। তাহলে আমার মনে হয় যে, এটা এক ধরনের… কী বলবো, এটা নিজের সাথে এক ধরনের প্রতারণা করা হয়। কারণ, আমি তো গল্পটা বলতে চাচ্ছি।
আপনি খেয়াল করে দেখেন, আমি যখন প্রথম আমার ওয়েব সিরিজ মহানগর বানিয়েছি ,মহানগরের তুমুল জনপ্রিয়তা ছিল, ন্যাচারালি, মহানগরের শেষে মহানগর দুই আসার একটা সম্ভাবনার গল্প বলা ছিল। কিন্তু আমি এর পরে বানিয়েছি সাবরিনা। আবার একই সাথে আমি মহানগর দুই বানালাম। মহানগর দুই বানানোর পরে মহানগর তিনের আসার সম্ভাবনা এবং দর্শকদের চূড়ান্ত আগ্রহ যে, মহানগর তিন দেখবো। এরপর আমি বানালাম জিম্মি। সেটাও একটা নারীকেন্দ্রিক চরিত্রের গল্প। মানে যেটা জয়া আহসানকে নিয়ে বানিয়েছি।
তো, আমি ডেলিভারেটলি মেক শিওর করি যে, আমি যেন ওই পপুলিস্ট ট্র্যাপের মধ্যে না পড়ি।
আমার কাছে মনে হয় কি, আমি যখন একটা মহানগর তৈরি করে আমার এক ধরনের অডিয়েন্স তৈরি হয়, তখন আমার দায়িত্ব হচ্ছে কি, এই ধরেন, এত সংখ্যক অডিয়েন্স যেহেতু মহানগরের জন্য তৈরি হয়েছে, আমার পরের কাজটা যদি আমি নারীকেন্দ্রিক করি তাহলে এখান থেকে কিছু অডিয়েন্স হয়তো সেটা দেখবে।
সিমিলারলি মহানগর দুই যখন আমি বানাই, অনেক বড় স্কেলে এবং আরো বেশি মানুষ পছন্দ করে, তখন অটোমেটিক্যালি আমার মনে হয় যে, পরের কাজটা আমি ওই পপুলিস্ট ঘরানাতে না গিয়ে একটু নারীকেন্দ্রিক এই গল্প… নির্মাতা হিসেবে আমার দায় হচ্ছে কি যে, একটু পুশ করা, একটু একটু পুশ করা।
আমি যদি সারাক্ষণ এই গল্পগুলো বলতে থাকি, তাহলে আমি অডিয়েন্সই পাবো না। সো, যার ফলে আমি তখন করি কি… হ্যাঁ, মহানগর দুই আমার এতো এতো অডিয়েন্স দেখছে, কাজেই ওকে, এখন ওখান থেকে কিছু একটু মানুষ জিম্মি দেখুক। এইভাবে আমি আমার নারীকেন্দ্রিক চরিত্রের যেসব গল্প করি সেগুলোর অডিয়েন্স যেন দিন দিন আস্তে-আস্তে একটু-একটু করে বাড়তে থাকে। আমার দিক থেকে আমি এই চেষ্টাটা সবসময় করে যাই। এটা যেন হয়। এবং আমার মনে হয় কি, আমাদের সবার এই চেষ্টাটা করা উচিত। স্পেশালি এমন একটা সময়ে, যখন একটা নারী সংস্কার কমিশনকে ওপেনলি গালাগালি করা হচ্ছে, একটা নারী সংস্কার কমিশনের গালাগালির প্রতিবাদে যখন নারীরা জড়ো হচ্ছেন, তার নিচে একদম, আমি যদি বলি যে, একেবারে ডানপন্থী থেকে শুরু করে শহুরে মধ্যবিত্ত অনেক পুরুষ, প্রতিক্রিয়াশীল পুরুষ, তারাও সমানে গালিগালাজ করে যাচ্ছেন। সেখানে আসলে আমার মনে হয়, শিল্পী হিসেবে বা সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে বাউন্ডারিটাকে আরেকটু পুশ করা। কারণ বাউন্ডারিটা ক্লোজড হয়ে আসছে।
বীথি: তো, আপনি যেভাবে চরিত্রগুলো বানান, তখন কি আপনি শ্রেণিচরিত্র দেখেন, যে এক একটা মানুষ… আমি শুধু নারীর কথা বলবো না, সকল চরিত্রের কথাই যদি বলি, এক একটা মানুষ এক একটা স্তরে, সমাজের এক একটা স্তরে থাকে। এবং তাদের যে আলাদা আলাদা করে শ্রেণিচেতনা থাকে, এক একজনের সংগ্রাম, লড়াইগুলো আলাদা আলাদা হয়।
নিপুন: আমার একটা কাজ আছে, দ্বন্দ্ব সমাস নামে। সেটা হচ্ছে একই চেহারার দুইজন, একজন হচ্ছেন পুরোহিত আরেকজন হচ্ছেন ইমাম, দুই গ্রামের। এবং একই চেহারার। কো-ইন্সিডেন্টালি একই চেহারার। আমরা তো জানি যে, একটা থিওরি আছে যে, পৃথিবীতে সাতজন মানুষের চেহারা একই রকম হতে পারে। সো, আমি ওই লিবার্টিটা নিয়ে একটা গল্প বলেছিলাম দ্বন্দ্ব সমাস নামে। এক গ্রামের একজন পুরোহিত এবং দূরের এক গ্রামের একজন ইমাম, মুয়াজ্জিন, একই চেহারার, এবং যখন আসলে ইন্টারচেঞ্জ হয়ে যায়, তখন এই ধর্ম নিয়ে মানুষের মধ্যে, এই দুই গ্রামের মধ্যে কী ধরনের প্রবলেম ক্রিয়েট হয় বা গোড়ামি বা যা-ই বলি না কেন, সেটা নিয়ে আমি গল্প করেছি। এটা পুরোপুরি গ্রামের গল্প একদম। সেটার জন্য আমি পুরস্কারও পেয়েছি সেরা চিত্রনাট্যকারের।
আমি আরো একটা কাজের কথা বলতে পারি, আমার খুবই পছন্দের কাজ। টেলিভিশনে ঈদের জন্য করা— এই শহরে। সেটাও কিন্তু একেবারেই লোয়ার ক্লাস একজন নার্সের গল্প। যার কাজ ছিল বাচ্চা চুরি করা। বাচ্চা চুরি করে বাচ্চা বিক্রি করে দেওয়া। একদিন একটা বাচ্চা বিক্রি করতে না পেরে ওই বাচ্চাটাকে তার কাছে রাখতে হয় বেশ কিছুদিন। কারণ কাস্টমার নিচ্ছে না। এবং কিভাবে তার ওই বাচ্চাটার সাথে এক ধরনের টান তৈরি হয় এবং সে পেশা থেকে ফেরত আসতে চায়… এটার গল্প বলা আছে। এটা একেবারে লোয়ার ক্লাসের গল্প।
আমি কখনো গল্প ঠিক করলে ক্লাস ভেদে গল্প ঠিক করি, তা না। আবার এট দ্য সেইম টাইম, আমার খুব পছন্দের একটা টেলিভিশনের কাজ আছে— ভিক্টিম। সেটাও হচ্ছে যে, হাসবেন্ডের এগেইনেস্টে সেক্সেচ্যুয়াল হ্যারাসমেন্টের অভিযোগ আসছে। সো, আমরা যখন দেখলাম কি যে, হ্যাশট্যাগ মি টু মুভমেন্ট যখন গোটা বিশ্বে খুবই আলোচিত হলো, তখন আমি খেয়াল করলাম যে… আমরা দুই পক্ষের গল্প শুনি, যে অভিযোগ করেছে এবং যে অভিযুক্ত। কিন্তু আমরা এর বাইরের মানুষদের গল্পটা জানি না। সো, আমার ভিক্টিম গল্পটাই ছিল যে, যে মানুষটার বিরুদ্ধে সেক্সচ্যুয়াল হ্যারাসমেন্টের অভিযোগ আনা হয়েছে তার ওয়াইফের উপর দিয়ে কি যাচ্ছে। কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত প্রমাণ হচ্ছে না ততক্ষণ পর্যন্ত তো… মানে, আমি মানলাম যে, আসলে যার এগেইনেস্টে অভিযোগ করা হয়েছে সে অভিযুক্ত হতেও পারে, দোষী হতেও পারে, কিন্তু তার ফ্যামিলি বা ওয়াইফ, সে তো কোনোভাবেই এটার সাথে জড়িত না। কিন্তু তাকে এক ধরনের সোশ্যাল স্টিগমার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। এই গল্পও আবার আমি করেছি। আমি আসলে ক্লাসটা চিন্তা করে দেখি না। আমার মনে হয় কি, আমি যে গল্পটা বলতে চাই, আমার মাথায় আসে, নির্মাতা হিসেবে, সেই গল্পটা কোন ক্লাসের জন্য বেস্ট ফিট হবে সেটা অনুযায়ী আমি হয়তো গল্পটা বলি।
বীথি: আপনার গল্পগুলোতে আমি যখন… আমার যে কয়েকটার কথা মনে পড়ছে, সাংবাদিক চরিত্রগুলো… একদম বিক্রি হয়ে যাওয়া, সমাজের যে সাংবাদিকদের দেখি যে, তারা আসলে কখনো কোনো ন্যায় বা মানুষের কথা বলে না, স্বার্থবিরোধী কাজকর্ম করতে দেখি। এটা কি আপনার অবস্থান নাকি এটা জাস্ট গল্পের অংশ?
নিপুন: না না, এটা অবশ্যই গল্পের অংশ, আমার অবস্থান না।
বীথি: মানে আপনি কি তার মানে মনে করেন, সাংবাদিকরা এখানে অনেক সৎ?
নিপুন: যে কোনো পেশার মধ্যে অবশ্যই সৎ এবং অসৎ সাংবাদিক বলি, সৎ এবং অসৎ ব্যবসায়ী, সৎ নির্মাতা অসৎ নির্মাতা আমাদের সমাজের মধ্যে আছে। আমি যদি এভাবে বলি যে, আমার স্ত্রী এলিটা করিম, উনি ডেইলি স্টারে অনেক বছর ধরে সাংবাদিকতা করেছেন, প্রায় বিশ বছর ধরে। বা আমার বন্ধুবান্ধব যারা সাংবাদিক আছেন, আমি মোর অর লেস জানি যে, তারা সৎ, বেশিরভাগ। এটা আসলে আমি কী চাই সেটার উপরে রিফ্লেক্ট করে না। গল্পের মধ্যে গল্পের প্রয়োজনে যদি ওখানে সাংবাদিকের চরিত্রটা কেমন হবে, সেটাই আসলে ডিফাইন করে। এটা এমন না যে, ওই প্রথমেই যেটা আমি বলেছি যে, আমি কখনো আমি যেটা চাই, সেইটাই আনতে চাই না। সেটা যদি চলে আসে তাহলে ওটা আসলে গল্প থাকে না। গল্পের প্রয়োজনে যদি দরকার হয়, তখন সাংবাদিকগুলো যেভাবে হওয়া দরকার, যে অ্যাকশনটা হওয়া দরকার, সেরকম থাকে। এটার সাথে আমার কোনো পার্সোনাল গ্রাজ বলি বা যাই বলি, সেটা একেবারেই নেই। বরং আমি বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিকের তুমুল ফ্যান। আমি মনে করি যে, গত ১৫ বছরে আমাদের উপর দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে যেভাবে নিপীড়ন চালানো হচ্ছিল, খুবই ডাইনামিক, সৎ, সাহসী কিছু সাংবাদিকদের কারণেই কিন্তু আমরা অনেক ধরনের… রাষ্ট্রের অনেক স্ক্যাম বলি বা রাষ্ট্রের অনেক অপরাধ বলি, সেগুলো কিন্তু আমরা ধরতে পেরেছি। সাংবাদিকরা না থাকলে কিন্তু আমরা আসলে পারতাম না। সো, এটা পুরোপুরি গল্পের প্রয়োজনে।
বীথি: আমাদের আলোচনাতে অনেকবারই আমরা মহানগর নিয়ে কথা বলেছি। আসলে মহানগরে একটা বিরাজমান বাস্তবতার যে প্রতিফলন ছিল, সেটা থেকে মহানগরের কথা বারবার উঠে আসে। মহানগর বানানোর পরে আমরা জানি, আপনাকে বেশ কয়েকবার অন্তত বিভিন্ন বাহিনীর কাছে যে যেতে হয়েছে, কথা বলতে হয়েছে। তাদের সঙ্গে দীর্ঘসময় বসে আলাপ করতে হয়েছে। এখন তো আসলে আওয়ামীলীগ সরকার নেই এবং আমি জানি না যে, সেই বাহিনীগুলো আপনাকে ডাকবে কি না বা ডাকলে কী ধরনের আলাপ হতে পারে। সেক্ষেত্রে মহানগর তিনের সম্ভাবনা কতটুকু এবং কখন?
নিপুন: এটা খুবই একটা ক্রিটিক্যাল প্রশ্ন। যেহেতু মহানগর এক বা মহানগর দুই যখন বানাচ্ছিলাম, তখন আমি জানতাম, মানে, স্পেশালি দুইটা বানানোর সময় আমি জানতাম যে, আমি এমন একটা সিস্টেম নিয়ে কথা বলছি, এক্সিস্টিং সিস্টেম নিয়ে, যারা এই কাজটা পছন্দ করবে না। এই গল্পের মাধ্যমে যে কথাগুলো উঠে আসবে সেটা পছন্দ করবে না। অবভিয়াসলি, সেই সরকার এখন নাই, বাট, আমার মনে হয় যে, সেই সিস্টেমটা এখনো রয়ে গেছে। আমরা যদি এভাবে বলি যে, গত এক বছরে সিস্টেমেটিক চেঞ্জ যদি বলি, খুব বেশি কিন্তু হয়নি। আমরা গণঅভুত্থান করেছি এত রক্তের বিনিময়ে এবং নতুনভাবে এক ধরনের সমাজ বা নতুন রাষ্ট্র তৈরি করার একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। কিন্তু গত এক বছরে খুব বেশি পরিবর্তন কি হয়েছে? হ্যাঁ, আমার হয়তো ঝুঁকি বাড়বে না, ডেফিনেটলি, যেহেতু আমি ওই সময় খুব বেশি সরব ছিলাম, সো, ঝুঁকি বাড়বে না। কিন্তু মহানগর তো দুর্নীতির গল্পই বলে। দুর্নীতি তো আসলে আছেই। বিভিন্ন জায়গাতেই প্রিভেল আছে। সো, আমার মনে হয় সেটা শুধু মহানগর তিন না, যেকোনো গল্প বলার ক্ষেত্রে আসলে, আমার মনে হয় খুব বেশি বাধা বা প্রতিবন্ধকতা আসবে না গল্পের সাবজেক্ট চুজ করার ক্ষেত্রে। আর যদি প্রশাসনিক বাধার কথা বলেন, আমার মনে হয় না যে, এখন আসলে খুব বেশি প্রশাসনিক বাধা হবে, যেটা গত বেশ কিছুদিন ধরে ছিল, গত ১৫ বছর ছিল। সো, দেখা যাক… আপনি আসলে জানতে চাচ্ছেন মহানগর তিন আসবে কি না। এটার আমি সরাসরি কোনো উত্তর এভাবে দেবো না।
বীথি: আমি জানতে চাই কি না তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে দর্শক জানতে চায়। আপনার দর্শকরা জানতে চায়। আচ্ছা, যেহেতু আমরা বাধা এবং প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কথা বলছিলাম সেই প্রসঙ্গেই মনে পড়লো যে, সেন্সর বোর্ডে আপনার একটা প্রস্তাব ছিল এবং আপনি খুব দৃঢ়ভাবে সে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং আমি বলতে পারি যে, অনেকেই কিন্তু খুব খুশি হচ্ছিলেন যে, আশফাক নিপুনের মতন একজন রাজনীতি সচেতন নির্মাতা যদি সেন্সর বোর্ডে থাকেন তাহলে তিনি প্রকৃত শিল্পটাকে হয়তো সেভাবে তুলে ধরতে পারবেন বা সেগুলোর দ্রুত মুক্তির ব্যবস্থা করবেন। আমরা জানি, বিগত সরকারের আমলে অনেক অনেক গল্প অনেক অনেক চলচ্চিত্র আটক পড়ে ছিল। সেখান থেকে আপনি এই প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে কী বার্তা দিতে চেয়েছেন?
নিপুন: আমি আসলে কঠিন কোনো বার্তা দিতে চেয়েছি, সেটা না। এটা ফিরিয়ে দেওয়ার পেছনে প্রথম কারণ যদি বলি যে, আমাকে জিজ্ঞেস না করে প্রজ্ঞাপনে আমার নাম দেওয়া হয়েছে। সো, আমার কাছে মনে হচ্ছিল যে, এটা একেবারে ঠিক হয়নি। আমার সাথে আলোচনা করা দরকার ছিল। বিকজ, আমি থাকতে চাইবো কি না চাইবো, সেটা তো আমার আমার ইচ্ছার ওপর ডিপেন্ড করে। আমরা বিগত সরকারের আমলে এটা দেখে এসেছি যে, হ্যাঁ, তোমাকে আসতেই হবে, তোমাকে করতেই হবে এটা। উনারা আসলে না বুঝে, ভুল করে করেছেন। উনারা আমার কাছে পরে ক্ষমাও চেয়েছেন যে, আসলে তখন সার্টিফিকেশন বোর্ড করার খুব বেশি দরকার কারণ অনেক ছবি মুক্তি দিতে হবে। কিন্তু সে পরিমাণ লোক পাওয়া যাচ্ছে না, বিকজ আমরা তো দেখেছি যে, বিগত সরকারের আমলে, মানে, একেবারে যদি আমি বলি যে, স্বৈরাচারের সুবিধা নেওয়া, বা স্বৈরাচারী সরকারকে সাপোর্ট দিয়ে যাওয়া লোকজনের সংখ্যাই বেশি ছিল। কাজেই এরা পাচ্ছিল না, সেই কারণে… আমার কাছে প্রথম কারণ ছিল সেটা। তার চেয়ে বড় কারণ, আমার মনে হচ্ছিল আমি এই কাজটার জন্য যোগ্য না। মানে, আমি প্রতিবাদ করি, আমি আমার কাজের মাধ্যমে প্রতিবাদ করি। কিন্তু এই যে ধরেন, সার্টিফিকেশন বোর্ড একটা ক্লারিক্যাল জব বা এক ধরনের ডিসিশন মেকিং জব। আমার মনে হচ্ছিল যে, আমি এখনো এটার জন্য আসলে প্রস্তুত না। কারণ এটা (এটার জন্য) একদম ডিফারেন্ট মেন্টালিটি, ডিফারেন্ট ম্যাচুরিটি দরকার। অনেক মানুষ খুশিও হচ্ছিলেন, সত্যি কথা, আমাকে অনেক মানুষ বলেছেন যে, যাক দিন শেষে আমরা হয়তো এটা পাবো। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল যে, না, আমার আরো পড়াশোনা করা দরকার। এই যে সেন্সরশিপ নিয়ে অথবা সার্টিফিকেশন নিয়ে আরো একটু পলিটিক্যাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকা দরকার। প্রশাসনিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকা দরকার। সেগুলো কোনো কিছু না করে আমি জাস্ট ঢুকে গেলাম একজন নির্মাতা হিসেবে, আমার মনে হচ্ছিল যে… তার মধ্যে আবার… আমি যদি বলি শিল্পের যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারগুলো থাকে, সেখানে আমি, আমরা শুরু থেকে বলে আসছি, বুরোক্রেসি যেন না থাকে। কিন্তু সেই বুরোক্রেসি এখনো আছে। মানে, আপনি যখন আসলে… এই যে ভেরি রিসেন্টলি জাতীয় অনুদান… সরকারি অনুদানের যে ছবিগুলো দেওয়া হয়েছে, সেটা নিয়েও কথা উঠেছে যে, পাঁচজন যদি ওখানে শিল্পী প্রতিনিধিত্ব করেন, পাঁচজন থাকেন সচিবালয় থেকে, বুরোক্রেসি থেকে। সো, এটাও আমার একটা আপত্তির জায়গা যে, আপনি শিল্পের ক্ষেত্রে যখন কোনো সার্টিফিকেশন বোর্ড বলি, অনুদান কমিটি বলি বা যেকোনো কিছু হতে পারে, সেখানে শিল্পকে প্রতিনিধিত্ব করে, এমন লোকের সংখ্যা বেশি থাকা উচিৎ, বুরোক্রেসির চেয়ে। কারণ, আমরা দেখে আসছি যে, বুরোক্রেসি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে পুরো ব্যাপারটাকে।
এটাও আমার একটা আপত্তির জায়গা ছিল যে, এই প্রসেসগুলোকে সংস্কার না করে, জাস্ট কিছু লোকজন, পপুলার লোকজনকে নিয়ে বসিয়ে দিলাম, তাহলে কিন্তু আসলে কাজের কাজ খুব বেশি হবে না। সো, যার জন্য আমার মনে হচ্ছিল যে, সংস্কারটা হওয়াটা দরকার ছিল।
বীথি: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তো, অবশ্যই সবসময় থাকবে না। নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে নতুন সরকার আসবে। আপনি কি তাহলে এমন কোনো সম্ভাবনা আসলে মিস করে গেলেন কি না, যেখানে আপনার আদতেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের অনেক সমস্যা সমাধান করার সম্ভাবনা ছিল?
নিপুন: এখনো এটা তো হাইপোথেটিক্যাল, আসলে। আমি যেহেতু যাইনি ওখানে, সো, আমি আসলে বলতেও পারবো না যে, কী কী সুযোগ মিস করলাম। বাট, আমার মনে হয় ওখানে যারা গেছেন, মানে, তখন যাদেরকে আসলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, দে ওয়্যার মোর দেন ক্যাপাবল। মানে, তা আমার মাইন্ড সেটের সাথে যদি বলি বা আমার আদর্শিক জায়গা থেকে বলি বা বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতিতে একটা পরিবর্তন আনার জন্য যতটুকু কাজ করা দরকার বলি, আমার মনে হয় তারা যথেষ্ট যোগ্য ছিলেন। ওখানে আমি গেলে যে আসলে খুব বেশি চেঞ্জ হতো তা না। তাদের মধ্যে অনেকে আবার পদত্যাগও করেছেন। আমরা জানি যে খিজির হায়াত খান পদত্যাগ করেছেন, কারণ উনি বলেছেন, উনি কাজ করতে পারছেন না। আমরা ভেরি রিসেন্টলি দেখেছি জাকিয়া বারী মম অনুদান কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন। বিকজ, উনার মনে হচ্ছিল যে, উনি আসলে কাজ করতে পারছিলেন না। সো, এটা আসলে আপেক্ষিক আলাপ। আমার মনে হয় যে, আমি ওখানে গেলে কতটুকু করতে পারতাম…
বীথি: এখন যেহেতু প্রচুর সংস্কার হচ্ছে, সংস্কার কমিশন হচ্ছে, কমিটি হচ্ছে, সেখান থেকে এমন কোনো কিছু কি করা সম্ভব, যেখানে একজন নির্মাতার একটা নির্মাণ যেন আটকে পড়ে না থাকে, কোনো আইন-কানুন পলিসি, যে কোনো কিছু হতে পারে…
নিপুন: শিল্প কিন্তু সারাক্ষণ জ্বি হুজুর করবে না। হ্যাঁ, শিল্প বিনোদন দেবে এটা সত্যি, যেহেতু এটাকে বিনোদন শিল্প বলা হয়। একই সাথে শিল্পের কাজ প্রশ্ন করা। শিল্প কোনো সমাধান দেয় না। শিল্পের কাজ কিন্তু সমাধান দেওয়া না। শিল্পের কাজ হচ্ছে প্রশ্নটা তোলা।
সো, এটা যেন বন্ধ হয়, সেটার জন্য যা যা পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, যেটা বিগত সরকারের আমলে আমরা সবচেয়ে বেশি দেখেছি যে, পছন্দ হচ্ছে না ন্যারেটিভ বা মনে হচ্ছে, কাজেই ছবিটা আটকে দাও। বা আমাদেরকে প্রশ্ন করা হচ্ছে, ছবিটা আটকে দাও। অথবা একটা ছবিকে আটকে দিয়ে অনেক সময় ঝিকে মেরে বউকে শিখানোর মত। একটা ছবিকে আটকে দিয়ে আরো দশটা ছবি, যারা আসলে এই ধরনের স্টেটমেন্ট নিয়ে আসতে চাচ্ছে, তাদেরকে এক ধরনের বার্তা দেওয়া যে, না এই ধরনের গল্প আর করা যাবে না। এটা পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করা যাবে, সমাজকে প্র্রশ্ন করা যাবে, সরকারকে প্রশ্ন করা যাবে, এই ধরনের ছবি যখন আসবে, তখন এই ছবিগুলো যেন মুক্তি পায়, এই ছবিগুলো যেন চলতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে। এবং সরকার তো রাষ্ট্রের দায়িত্বেই থাকে। সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে।
আমি এবার অন্য একটা আশঙ্কার কথা বলি। সেটা হচ্ছে, একটা তো আমি বল্লাম রাষ্ট্রযন্ত্র। আমরা ভেরি রিসেন্টলি হঠাৎ করে একটা নতুন ফেনোমেনা আবিষ্কার করেছি, সেটা হচ্ছে মব। আরেকটা আমার কাছে মনে হচ্ছে যে, সামনে হয়তো আরেকটা নতুন ফেনোমেনা আসতে পারে। সেটা হচ্ছে, আমি যে ধরনের গল্প বলতে চাই, সেই ধরনের গল্প কোনো পার্টিকুলার গোষ্ঠীর পছন্দ না হলে, সেটার বিরুদ্ধে যখন কোনো রকমের আন্দোলন বলি বা ঘেরাও বলি, তখন যেন নির্মাতা বা এই কলাকুশলী বা সিনেমাটার কথাই বলি বা সিরিজের কথা বলি, যেটাই বলি না কেন, সেটা যেন নিরাপত্তা পায়। সেটা যেন ঝুঁকির মধ্যে না থাকে। এটা যেন ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র বা সরকার বা এই যে সার্টিফিকেশন বোর্ড কমিটি বলি বা মন্ত্রণালয়— এরা যেন নিশ্চিত করে। আমার মনে হয় সেটা খুব বেশি দরকার হবে ভবিষ্যতে।
বীথি: রাষ্ট্রের যে এই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে, আপনার কি মনে হয়, তারা নির্মাণের সৃজনশীলতাটাকে দমন করে কোনোভাবে?
নিপুন: দমন করে কথাটা আসলে… দমন তো করতো অবভিয়াসলি। আপনি যদি, এভাবে দেখি আমরা যে…
বীথি: আমি বলছি সিস্টেমটা… বিদ্যমান যে সিস্টেমটা…
নিপুন: হ্যাঁ, সিস্টেমের কথা বলছি। যেহেতু এটা অনেক বছর ধরে চলে আসা একটা সিস্টেম, ও একভাবে অভ্যস্ত, ও অন্যভাবে ডিল করতে অভ্যস্ত না। সো, না চাইতেই এক ধরনের তো দমননীতি আসলে থাকেই। এবং এটা হচ্ছে শঙ্কার বিষয়, আমি যদি বলি এভাবে যে, আমাদের সাংস্কৃতিক সেক্টরটাকে যদি প্রপারলি রিফর্ম করা না হয়, সিস্টেমটাকে, আমি মানুষ বলছি না, সিস্টেমটাকে, তাহলে হয়তো এই সিস্টেমটা রান করার জন্য সামনে যে মানুষজন আসবেন, উনারা হয়তো সেই আগের সিস্টেমেই হয়তো চালাতে চাইবেন, যেটা আমাদের জন্য খুবই আশঙ্কাজনক। শিল্পকে আসলে কোনো বাউন্ডারির মধ্যে আটকে রাখা উচিৎ না। সংস্কৃতিকে কোনো বাউন্ডারির মধ্যে আটকে রাখা উচিৎ না। শিল্প-সংস্কৃতি টিকবে কি টিকবে না, এটা সময় ডিসাইড করবে। ওটা আসলে আমি বা মব ডিসাইড করতে পারবে না যে, না, এটা চলতেই পারবে না, এটা হবে না। ন্যারেটিভ যদি আসলে আপনি দাঁড় করাতে পারেন তাহলে সেটা টিকে যাবে, ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে না পারলে সেটা মানুষ ছুঁড়ে ফেলে দেবে।
বীথি: আপনার কথা যদি আমরা বাদও দিই, শিল্পের কাজ কিন্তু সমাজ বিনির্মাণে এক ধরনের ভূমিকাও রাখা। সেক্ষেত্রে নতুন কোনো ন্যারেটিভ যদি একটা সমাজ বাস্তবতায় কোনোভাবেই প্রতিফলন ফলন না ঘটে বা শুধু একটা গোষ্ঠী বা কয়েকটা গোষ্ঠীর মনোরঞ্জন করার জন্য যদি একই ধরনের কন্টেন্ট তৈরি হতে থাকে, সেক্ষেত্রে আসলে সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখার জায়গাটা কতটা?
নিপুন: পপুলিজম ইজ এ ট্র্যাপ। আমার কাছে মনে হয়, শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে। ট্র্যাপ কেন? কারণ, আপনি যখন একবার পপুলার হয়ে যাবেন… এবং আপনার তো এক ধরনের দর্শক তৈরি হয়। একটা সময়ে আপনি আপনার গল্পটা বলতে চান। তারপর সেটার একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। যখন অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয় তখনই তো একটা পপুলিস্ট অডিয়েন্স দাঁড়ায়। একটা সময় গিয়ে এই অডিয়েন্সই আপনাকে ডিক্টেট করা শুরু করে যে, হ্যাঁ এই ধরনের কাজ, এটা হওয়া উচিত, এটা এরকম বা আপনি এটাই করেন, আমরা এটাই দেখবো। আমার মনে হয়, যে কোনো নির্মাতার খুবই সচেতন ভাবে এই পপুলিস্ট ফর্ম থেকে বের হয়ে আসা উচিত। আমি নিজেই চেষ্টা করি, আমি যদি আমার এক্সাম্পল দিয়ে বলি, আমার টেলিভিশনের কোনো কাজ কিন্তু খুব… টেলিভিশনের জন্য যখন আমি ফিকশন বানাতাম তখন কিন্তু কোনো কাজই আমি খুব পপুলিস্ট ফর্মের মধ্যে করিনি। এখন মানুষ প্রেমের কাজ দেখতে বেশি দেখছে বেশি সো আমি প্রেমের গল্প করি, না, আমি তখন হয়তো খুবই সিরিয়াস সিরিয়াস সাবজেক্ট নিয়ে গল্প করেছি। এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং নিয়ে, গুম নিয়ে, হ্যাশট্যাগ মিটু আন্দোলন নিয়ে, যেখানে বাংলাদেশের বেশিরভাগ পুরুষের ধারণা এগুলো হচ্ছে সব স্ক্যাম, সেখানে আমি এই গল্পগুলো করার চেষ্টা করেছি। বা আমি যখন সিরিজের কথা বলছি, তখন আপনি যদি খেয়াল করে দেখেন, আমি একটা মহানগরের পরে সাবরিনা বানিয়েছি। মহানগরের পরে মহানগর টু বানানো আমার জন্য সবচেয়ে সেফ ছিল। বা আমি মহানগর টু এর পরে মহানগর থ্রি বানানো সবচেয়ে সেফ। আমি বানিয়েছি জিম্মি। সেটাও একটা নারীকেন্দ্রিক গল্প। কারণ, আমি নিজেকে সারাক্ষণ ওই কমফোর্ট জোন থেকে বের করে আনতে চাই। কারণ শিল্পের কাজ কিন্তু আপনাকে কমফোর্ট জোনের মধ্যে রাখা না। কমফোর্ট জোনে যদি আপনি থাকেন তাহলে আপনি সেইম গল্পই বলতে থাকবেন। তাতে সমাজের কোনো লাভ হয় না। এন্ড মোস্ট ইম্পর্টেন্টলি দর্শক কিন্তু একসময় বোওর্ড (বিরক্ত) হয়ে যায়। দর্শক কিন্তু নতুন কিছুই চায়। আমি পার্সোনালি, আমি এত বছরের এক্সপেরিয়েন্স থেকে একটা জিনিস জেনেছি, সেটা হচ্ছে দর্শক আপনাকে হয়তো সরাসরি অতটা সতর্ক করে না যে, না ভাই, তোমার কাজ স্টেইল হয়ে যাচ্ছে, তোমার কাজ বোরিং হয়ে যাচ্ছে বা তুমি একই গল্প বারবার বলছো বা তোমার কাজ খুব পপুলার হয়ে যাচ্ছে। দর্শক কিন্তু ধরতে পারে। যার কারণেই কিন্তু মহানগর জনপ্রিয় হয়েছে। তার কারণেই আমি বলি যে, এই ধরনের কাজগুলো জনপ্রিয় হওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু কেন হয়েছে? কারণ, দর্শক নতুন কিছু দেখতে চায়। সো, আমাদের দর্শক অনেক এডভান্স। নির্মাতা হিসেবে, শিল্পী হিসেবে আমাদের দায়িত্বই হচ্ছে, আমি সবসময় বিশ্বাস করি বাউন্ডারিটা পুশ করা। আপনাকে দর্শককে তার কমফোর্ট জোনের বাইরে নিতে হবে। একটু একটু করে নিতে হবে। আপনি রাতারাতি নিতে পারবেন না। আপনি এক ধাক্কায় দেওয়ালটা ভাঙতে পারবেন না। কিন্তু আপনাকে দেওয়ালের মধ্যে আঘাত করে যেতেই হবে, যেতেই হবে। হ্যাঁ, দেওয়ালের মধ্যে আঘাত করলে পাল্টা আঘাত আসবে, আপনার হাত ব্যথা হবে, অনেক সময় মনে হবে যে, এটার কোনো ফলাফল নেই, এ দেওয়াল কোনোদিন ভাঙবে না। কিন্তু, আমার মনে হয় যে, শিল্পের কাজ সেটা, যেটা আমাদেরকে করে যেতেই হবে।
বীথি: আমরা যখন পুরনো সিনেমাগুলো দেখি, যেমন সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, ঋতুপর্ণ ঘোষ, তাদের চলচ্চিত্রগুলো দেখার সময় মনে হয় না, হঠাৎ করে যে, আচ্ছা এই ঘটনা তো এখনকার প্রেক্ষাপটে ঘটছে! উনারা কী পরিমাণ দূরদর্শী থাকলে, এই ধরনের থিম নিয়ে কাজ করা যায় (করতে পারেন)। তো, সেখান থেকে আমার মনে হয় যে, অনেক জায়গায় শিল্পীরা অনেক এগোনো থাকে সমাজে। তারা যেটা দেখায় সেটা ১০ বছর ১৫ বছর ২০ বছর ৩০ বছর পরে সেটার একটা বাস্তবতা তৈরি হয়। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক পটভূমি পরিবর্তনে বা রাজনৈতিক যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে পরিবর্তিত একটা সমাজ যদি আমরা চিন্তা করি, সেখানে আসলে শিল্পীদের অনেক ভূমিকা আছে যে, তারা আসলে কেমন ভবিষ্যৎ চায় বা মানুষকে এক ধরনের স্বপ্ন দেখানো, সেখান থেকে কি নিজের দায়বদ্ধতা আপনি কখনো বোধ করেন কি না?
নিপুন: অবশ্যই। আমি বিশ্বাস করি, শিল্পীর আসলে… এটা আমি বিশ্বাস করি, সব শিল্পী যে বিশ্বাস করেন তা না। আমার মনে হয় যে, শিল্পীর কিন্তু খুব বেশি চাহিদা নেই। শিল্পীর গাড়ি বাড়ির চাহিদা নেই। শিল্পীর টাকা পয়সা বানানোর চাহিদা নেই। আমি শিল্পীর কথা বলছি, ইন জেনারেল, প্রকৃত শিল্পী। শিল্পী যেটা চায় সেটা হচ্ছে, সে টাইমলেস হয়ে থাকুক। তার কাজকে যেন ১০ বছর ২০ বছর ৫০ বছর পরে মানুষ পছন্দ করে। আপনি খেয়াল করে দেখবেন যে, শিল্পী কিন্তু খুব বেশি… আমি যদি এভাবে বলি… আমাদের দেশের কথা বললে তো আরো বেশি, আমাদের দেশের শিল্পীরা কিন্তু সত্যিকার অর্থে, যারা শিল্পচর্চা করতে চান তারা এখনো হান্ড্রেড পার্সেন্ট প্রফেশনালি কাজটা করতে পারে না। কারণ, এখানে শিল্পীদের ওভাবে কদর করা হয় না। আমাদের এখানে দর্শকদের থেকে ধরে নেওয়া হয় যে, শিল্প থাকবে ফ্রি। আমি গানটা শুনবো ফ্রি। আমি সিনেমা বা সিরিজ আসছে, সেটা আমি টরেন্ট থেকে নামিয়ে নেব, এটা আমি পয়সা খরচ করে কেন দেখবো? এটা এক ধরনের আমাদের এখানে চর্চাই হয়। তাও আমাদের দেশে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও শিল্পীরা কাজ করে যান নিরন্তর, শুধু একটা কারণেই, লোভ বলি, লোভ বলা উচিত না, এটা লোভের ঊর্ধ্বে। এটা হচ্ছে এক ধরনের ইচ্ছা। সেটা হচ্ছে টাইমলেস হওয়া। সে যে কাজটা করছে, সেটা ২০ বছর ২৫ বছর ৩০ বছর ৫০ বছর পর যেন মানুষ স্মরণ করে। তাকে যেন একটু স্মরণ করে। অবভিয়াসলি সবার মতো আমারো ডেফিনেটলি ইচ্ছাটা থাকে। কিন্তু এই টাইমলেস হওয়াটা… এটা না, আমি চাইলাম আর হয়ে গেলাম, এটা আসলে হয় না। যেমন ধরেন, আমি যদি একটা এক্সাম্পল দিই— হীরক রাজার দেশে, সত্যজিৎ রায় বানিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে। ইমার্জেন্সির সময় বানানো। উনি বানিয়েছিলেন উনার দেশের কন্টেক্সটে। উনি এই কাজটা করেছিলেন। কিন্তু মারাও গেছেন। আমরা কিন্তু এই সত্যজিৎ রায়ের হীরক রাজার দেশের স্লোগান— দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খানখান… সেটা আমরা ২০২৪-এর যে সবচেয়ে বড় গণ অভ্যুত্থানটা হলো সেখানেও স্লোগান আকারে দেখেছি। এটা উনি কিন্তু জানেন ও না। উনি তো মারা গেছেন, উনি নেই। কিন্তু দেখেন, এই যে টাইমলেস হওয়ার ব্যাপারটা, যার ফলে ওটা কিন্তু রয়ে গেছে আমাদের এখানে। এই ধরনের গান— এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে, এই গানটা কিন্তু গাওয়া হচ্ছে বা ধরেন আমি যদি জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়ার গল্প বলি, এটা যে সময় বানানো, পাকিস্তান আমলে, আমরা এখনো যে আমরা এই খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে, সেটা এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, কতটা টাইমলেস। এবং এখন থেকে ২০ বছর পরে আবার এ ধরনের ক্রাইসিস হবে, আমরা আবার এগুলোর ভেতরে ফেরত যাব। এগুলোর কাছেই ফেরত যাব যে, এদের থেকে ইন্সপিরেশনটা নেব। এটা হওয়াটা ডেফিনেটলি। এই ইচ্ছা তো, লোভটা তো ডেফিনেটলি থাকে। কিন্তু এটা না, আসলে চাইলাম আর হয়ে গেলাম, সেটা না। আমার মনে হয় কি, সততাটা খুব ইম্পর্টেন্ট। কারণ, আপনি যাদের নাম বললেন, তারা কিন্তু কখনো এটা চিন্তাই করেনি যে, এটা তাদের এই গল্পটা বা তাদের এই সিনেমা, তাদের এই কাজ, এটা আসলে ২০ বছর ২৫ বছর ৫০ বছর পরও মানুষ মনে রাখবে। তারা আসলে ওই সময়ের দায় মেটানোর জন্য, ওই সময়ে, ওই কাজগুলো করেছিলেন। এটা একেবারেই সময়ের দায় মেটানো। সো, যদি আপনার নির্মাণের মধ্যে, সময়ের দায় মেটানোর মধ্যে সততা থাকে তাহলে এটা টিকে যাবে। আর যদি তার মধ্যে কোনো সততা না থাকে, আপনার যদি মনে হয় যে, হ্যাঁ, এখন এটা হচ্ছে খুব ট্রেন্ডিং, সো, আমি এখন বানাই। যেমন, আমি একটা ছোট এক্সাম্পল দিই যে, আমরা তো ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের ফলে আমরা একটা নতুন সমাজ পাবো বলে আশা করছি। আমি জানতামই যে, এখন প্রচুর কাজ হবে যে, ধরেন হাসিনা-শাসন নিয়ে। প্রচুর কাজ হবে, বিকজ দিস ইজ ভেরি ট্রেন্ডিং। এখন হয়তো অনেক দেখতে পাবো। আমরা এখন কথা বলতে পারছি না যে, এখন বলতে থাকবো, বলতে থাকবো। সো, এর মধ্যে কতটা টাইমলেস হবে এটা ডিপেন্ড করবে কে কতটা সততা নিয়ে বানাচ্ছে সেটার উপরে। সো, আমার মনে হয় যে, সততাটা দরকার। টাইমলেস হবে কি না হবে, সেটা শুধু সময়ের উপরে ছেড়ে দিতে হবে।
বীথি: একটা বহুল প্রচলিত বাক্য আমরা প্রায়ই বলতে শুনি, যখন স্পেশালি বিগত বছরগুলোতে আমরা শুনেছি যে, আর্ট ফর আর্ট সেক। যেন আর্টটা হচ্ছে সমাজ-বিচ্ছিন্ন, রাষ্ট্র-বিচ্ছিন্ন, অন্য কোনো একটা গ্রহ থেকে এসেছে এবং সেখানে সমাজের কোনো কিছু থাকবে না। মানে এই আর্টসেকটা আসলে কি? আর্ট কি তার মানে, সমাজ রাষ্ট্র নিয়ে কথা বলবে না?
নিপুন: না না, অবভিয়াসলি… আমার মনে হয় কি আর্ট ফর আর্ট সেক যেটা হয় সেটা তো এক ধরনের আইডিয়ালিজম। আরেকটা কি বললেন? সোসাইটি স্টেক যদি বলি বা দায়ের জায়গাটা… আমার মনে হয়… আমি এটাকে এভাবে জাজ করি, এই ক্ষমতা বা এই আগ্রহটা সবার আসলে থাকে না। মানে, আর্টস ফর সোসাইটি স্টেক যদি বলি— সমাজের জন্য শিল্পের চর্চা, এটা করার মতো ম্যাচিউরিটি আসলে সবার আছে কি না, সেটা আসলে ব্যাপার। মানে, আমি চাইলাম যে, আমি আজকে এসে সমাজের গল্প বলবো কিন্তু আমার সমাজের আন্ডারস্ট্যান্ডিং কেমন সেটার উপর ডিপেন্ড করছে। আমার পলিটিক্যাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং কেমন সেটার উপর ডিপেন্ড করছে। সো, আর্টস ফর আর্ট সেক, রিলেটিভলি করাটা আমার মনে হয় যে, আসলে সহজ। সহজ আমি এই অর্থে বলছি যে, আর্টস ফর সোসাইটি স্টেক এটা চাইলে আসলে করা যাবে না। কারণ, এটার মধ্যে গ্রুমিংয়ের ব্যাপার আছে, এটার মধ্যে পড়াশোনার ব্যাপার আছে, এটার মধ্যে আপনার এক ধরনের সমাজ সচেতনতার ব্যাপার আছে। আমি চাইলাম আজকে যে, দুইটা পেপার পড়লাম, দুইটা বই পড়লাম, বই পড়ে চিন্তা করলাম যে, না, আমি সমাজ বিনির্মাণের জন্য বানাবো, এভাবে আসলে আর্ট হয় না। এটা না, আপনার বড় হওয়ার মধ্যে, একটা শিল্পীর বড় হওয়ার মধ্যেই, এটা আসলে ডিপেন্ড করে। আমি একটা এক্সাম্পল দেই। আমার খুব ফেভারিট একজন ফিল্মমেকার আছেন, টার্কিশ ফিল্মমেকার ইয়েলমাস গুনে। উনি সারাজীবন জেলখানায় কাটিয়েছেন, সারাজীবন। উনি টার্কির একসময়কার, আমি যদি বলি যে, টার্কির টম ক্রুজ ছিলেন। মানে সুপার ডুপার স্টার। হি ওয়াজ এন অ্যাক্টর। উনি অ্যাক্টর ছিলেন এবং উনি ওই টার্কির, ওই সময় মেগাস্টার। মানে, যত কমার্শিয়াল সিনেমা, সবকিছুতে উনি ছিলেন সবচেয়ে টপে এবং উনার লাইফ কিন্তু খুব ভালো যাচ্ছিল। কিন্তু কোথাও গিয়ে উনাকে টার্কির ওই সময়কার সমাজ-রাষ্ট্র এমনভাবে এফেক্ট করেছিল, উনি সরাসরি স্টারডম বাদ দিয়ে, অ্যাক্টিং বাদ দিয়ে ফিল্ম মেকিংয়ে নামলেন। এবং উনার প্রথম ছবি যেটা বানালেন, ইয়োল, যেটা কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পাম দরজিতে ছিল। ইয়োল বানানোর পরে তাকে যে জেলখানায় ঢুকানো হয়েছে, উনি এর পরে ছয় থেকে সাতটা ছবি বানিয়েছেন, সব জেলখানার ভিতর থেকে। এবং একটার চেয়ে একটা ছবি ক্লাসিক এবং ওই সমাজকে প্রশ্ন করা। তো, আমার পয়েন্ট হচ্ছে কি, উনি যখন সুপার স্টার ছিলেন, তখন কারো ধারণাই ছিল না যে, উনি আসলে এমন গল্প বলবেন যে, এই গল্পের কারণে রাষ্ট্র উনাকে জেলখানায় পুরে দেবে। কিন্তু, এটা না, উনার ভেতর থেকে তৈরি হচ্ছিল। উনার সাথে সমসাময়িক অনেক স্টারও ছিল। উনাদের মধ্যে হয়নি, উনার মধ্যে আসছে। সো, আর্ট ফর ফর আর্ট সেক, এটা আমরা আর্ট যারা প্র্যাক্টিস করি, করেই যাই। কিন্তু আর্ট ফর সোসাইটি স্টেক যদি বলি, এটা আমি চাইলেই পরবো না। এই ক্ষমতা নিয়ে আসলে সবার জন্মও হয়নি যে, আমি আসলে এটা লিখবো, কতটুকু লিখবো, আসলে কটতুটু ধরা দেবে। সো, আমার মনে হয় যে, অবশ্যই সমাজের বিনির্মাণের দায়টা থাকতে হবে। কিন্তু এই দায় না, রাতারাতি তৈরি হয় না। দুইটা পেপার পড়লাম, হঠাৎ করে দেখলাম যে, ফেসবুকের মধ্যে লেখালেখি করলাম, তারপর আমার মনে হলো যে, আমি বানাবো, ওইটা আসলে শিল্প হয় না, শেষমেষ।
বীথি: আপনার কাছে আমার শেষ প্রশ্ন। যারা এখন সিনেমা বানাতে চান বা যারা একদম নতুন সিনেমা নির্মাণে আসতে চাচ্ছেন, পেশা হিসেবে নিতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য যদি আপনার পার্টিক্যুলার কোনো উপদেশ, পরামর্শ কিছু থেকে থাকে…
নিপুন: আমি উপদেশ বলতে চাই না, কারণ, আমি আসলে এত বড় হয়ে যাইনি যে, ওদেরকে উপদেশ দেবো। আমি আসলে বড় ভাই হিসেবে দুইটা কথা যদি বলতে বলি, ওসি হারুনের মতো দুইটা কথা মনে রাখবেন, সেরকম, বড় ভাই হিসেবে যদি, দুইটা কথা মনে রাখবেন। আমার কাছে মনে হয়, সেটা হচ্ছে একটা (জিনিস) খুবই দরকার, সেটা হচ্ছে অনেস্টিটা ইজ ভেরি ইম্পর্টেন্ট। অনেস্টি ইজ এ ভেরি ভেইগ ওয়ার্ড…
বীথি: এটা কিন্তু অনেক ভেইগ, এক্সাক্টলি।
নিপুন: হ্যাঁ হ্যাঁ অনেস্টি ইজ এ ভেরি ভেইগ ওয়ার্ড, হ্যাঁ
বীথি: কোন জায়গার অনেস্টি?
নিপুন: আমার কাছে মনে হয় যে, নির্মাণের সততা বা দর্শনের সততা। এটা সবচেয়ে বেশি ইম্পর্টেন্ট। হ্যাঁ, অবভিয়াসলি যেহেতু ফিল্ম মেকিং ইজ এ ভেরি এক্সপেন্সিভ মিডিয়াম। বলা হয় যে, আর্টের সবচেয়ে এক্সপেন্সিভ মিডিয়ামটা হচ্ছে ফিল্ম মেকিং। মানে, আপনি যদি একজন পেইন্টার হন, একটা ছবি আঁকতে কিন্তু আপনার অত খরচ হয় না। আপনি যদি একজন কবি হন, আপনার কবিতা লিখতে অত খরচ হয় না। কিন্তু সিনেমা বানাতে গেলে টেকনিক্যাল রিজনে আপনার প্রচুর পরিমাণ অর্থের লগ্নি করতে হয়। একজন প্রডিউসার আসে, সে লগ্নি করে। আমার কাছে মনে হয় যে, যারাই নির্মাণ করতে আসছেন তাদেরকে দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করতে হবে। সেটা স্ট্রাগলের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী স্ট্রাগল। আজকে আমি একটা কাজ করলাম, সেটা কালকে জনপ্রিয় হবে, তা না। আরেকটা হচ্ছে স্থায়িত্ব। দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব। সেটার ক্ষেত্রে আমি বলছি, অনেস্টি। আপনি যে গল্পটা বলতে চান, যে কথাটা বলতে চান, যে দর্শনটা দর্শকের কাছে ছড়িয়ে দিতে চান, সেটা বলার ক্ষেত্রে আপনাকে অনেস্ট থাকতে হবে। সৎ থাকতে হবে। সেখানে কোনো গিমিকের আশ্রয় নিলে হবে না। সেখানে কোনো পপুলিজমের আশ্রয় নিলে হবে না। হ্যাঁ, আপনার হয়তো কষ্ট হবে। আপনার হয়তো প্রথম দিকে মনে হবে যে, না, এভাবে তো চলছে না। বেটার আমি একটু শর্টকাট নেই। সো, ওটা করা যাবে না।
আমার কাছে মনে হয় যে, সততা হচ্ছে, আপনার লাইফ স্টাইলের মধ্যেও সততাটা থাকতে হবে। আদারওয়াইজ আপনি আসলে পারবেন না। মানে, আপনার কিন্তু আসলে দীর্ঘমেয়াদী হবে না। আপনি রাতারাতি হয়তো কিছুটা জনপ্রিয়তা পাবেন। তারপর আবার আপনি হারিয়ে যাবেন।
সো, সততা খুব ইম্পর্টেন্ট যে, আপনি যে নির্মাণটা করছেন সেখানে সৎ থাকেন। আপনার ব্যক্তিজীবনের সততার কথা আমি বলছি না। আপনি বন্ধুদের সাথে সৎ কি না, আপনি আপনার স্ত্রীর সাথে সৎ কি না, বাবা মার সাথে সৎ কি না, সেটা না। আপনি যে কাজটা করতে আসছেন, এটা খুবই সেনসিটিভ একটা কাজ। বিকজ, এটার মানুষকে রিচ করার ক্ষমতা অনেক বেশি। কাজে আপনি যদি অসততা নিয়ে কোনো কাজ করেন সেটাও মানুষ ধরে ফেলবে। সো, এখানে সততা ইজ ভেরি ইম্পর্টেন্ট। আর সেকেন্ড থিংস, আমি যেটা বলব, সেটা হচ্ছে যে, পপুলিজমের চক্করে না পড়া। মানে, পপুলিস্ট হওয়ার চক্করে না পড়া। ফেসবুকের কল্যাণে… ফেসবুকের কল্যাণে আমি যদি বলি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে, আমরা এমন একটা সময়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে সবাই খুব তাড়াতাড়ি পপুলার হতে চায়। বাংলাদেশি ডিরেক্টররা কখনো ফোর গ্রাউন্ডে ছিলেন না। সবসময় স্টাররাই, এখনো ফোর গ্রাউন্ডে স্টাররাই। স্টিল মানুষজন ডিরেক্টরদেরকে চিনতে পারছে, হয়তো এটা…
সো, এই যে পপুলার হওয়ার জন্য… আমি আজকে পপুলার হবো, পপুলার হয়ে যাব, এই পপুলিস্ট হওয়ার যে চক্করটা, সেখান থেকে বের হওয়া খুব বেশি দরকার। সেটা যদি না থাকে, পপুলার হওয়ার থাকলে সে অটোমেটিক্যালি পপুলার হবে। পপুলার হওয়া কিন্তু কারো নিজের উপরে ডিপেন্ড করে না। আপনি যদি আপনার জায়গাতে সৎ থাকেন, আপনি কোথাও না কোথাও, কোনো না কোনো সময় আপনি পপুলার হবেন। সেটা হয়তো ছোট নাম্বারের মধ্যে হবেন, একদিন হয়তো বড় নাম্বারের মধ্যে হবেন। আমি নির্মাতা বা রাইটার হিসেবে একটা জিনিস বিশ্বাস করি যে, যে মুহূর্তে কোনো গল্পের আইডিয়া আমার মাথায় আসে, সেই মুহূর্তেই সেটা দেখার দর্শক কিন্তু অলরেডি তৈরি হয়ে যায় পৃথিবীতে। মানে আমার আইডিয়াটা কিন্তু আসমান থেকে আসে না। আমার যে আইডিয়াটা, হ্যাঁ, কিছু আইডিয়া হয়তো ইমিডিয়েটলি আমার দেশের মানুষ দেখবে না, কিন্তু বিদেশে হয়তো এটার দর্শক আছে। দর্শক কোথাও না কোথাও আছে। কোনো না কোনো জায়গাতেই আছে। সো, অনেস্টি ইজ ভেরি ইম্পর্টেন্ট। আর পপুলিজমের চক্করে না পড়া। এই দুইটা জিনিস যদি থাকে তাহলে যত রকমের বাধা আসুক, প্রতিবন্ধকতা আসুক, আপনি এটা উৎরে যেতে পারবেন।
বীথি: আমি ভাবছিলাম শেষ প্রশ্ন করে ফেলেছি। কিন্তু আমার মাত্র আপনার কথা শুনতে শুনতে মনে পড়লো, আমার খুবই কঠিন একটা প্রশ্ন হচ্ছে, ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন, আমি আমি সিনেমা বানাই, কারণ আমার কাছে মনে হয় কথা বলার এর চেয়ে ভালো মাধ্যম আর কিছু হতে পারে না। আমি যদি খুঁজে পাই আর কোন মাধ্যমে আমি এর চেয়ে ভালো করে কমিউনিকেশন করতে পারবো, মানুষের সাথে কমিউনিকেট করতে পারবো, তাহলে আমি সেখানে চলে যাব। আপনার কাছে আমার প্রশ্ন, আশফাক নিপুন কেন চলচ্চিত্র, কেন নাটক, কেন একটা শিল্প বানায়?
নিপুন: হ্যাঁ, আমি ঋত্বিক ঘটকের কথা কোট করি। ঋত্বিক ঘটক তো, বিয়িং ঋত্বিক ঘটক। মানে, উনি যে ধরনের প্রতিবাদী ছিলেন, উনি এই কথাটা বলেছেন যে, আমি যদি সিনেমার চেয়ে বেটার কোনো মাধ্যম পাই দর্শকদের কাছে, মানুষের কাছে পৌঁছানোর, আমি সিনেমাকে লাথি মেরে চলে যাব। উনি লাথি মেরে কথাটা বলেছিলেন। এই কারণে এই কথাটা আমার মনে আছে। হ্যাঁ, অবভিয়াসলি আমিও বানাই। আসলে আমি যে সময়ে এই প্রফেশনে এসেছি বা বাংলাদেশে এখনকার মধ্যেও যদি বলি, এটা যে খুব লাভজনক, ফাইন্যান্সিয়ালি লাভজনক প্রফেশন, সেটাও কিন্তু না। কিন্তু ওই যে, যে কথাটা বললাম যে, এক ধরনের তাড়না থেকে, এক ধরনের দায় থেকে… এটা এটা আসলে বললে খুবই পম্পাস শোনায়, খুবই মনে হয় যে, নিজের কথা নিজে বলছি। কিন্তু আমার মনে হয় যে, কোথাও না কোথাও এক ধরনের দায়, তাড়না না, কিছু না কিছু একটা কাজ করে। আসল, যে কাজটা হচ্ছে, সেটা কেন হচ্ছে, সেটা হওয়া উচিত না। বা আমরা আসলে ভবিষ্যতে কোথায় যেতে পারি, কোন জায়গায় আসলে আমরা ল্যান্ড করতে পারি বা আশঙ্কার জায়গা, এটা আমার মনে হয় কি যে, আমি যেন অনেক মানুষের সাথে শেয়ার করতে পারি, এইটার একটা তাড়না বোধহয় ছিল।
আমি একটা কথা বলি, যেটা আমি সবসময় বলেছি যে, আমি এখনো শিল্পী হতে পারিনি। শিল্পী কিন্তু কেউ চাইলেও হতে পারে না। মানে, আপনি আজকে ঠিক করতে পারবেন না যে, আমি আজকে গান করবো। এটা না আপনার ভেতর থাকতে হবে। গলাটা আপনাকে নিয়ে আসতে হবে। আপনি চাইলেই বলতে পারবেন না যে, আমি আজকে রাইটার হয়ে যাব। মানে লেখাটা থাকতে হবে। সো, আমারও মনে হয় যে ফিল্ম মেকিংয়ে আসাটা… আমি মনে হয় এটাই করতাম। আমি মনে হয় আর কিছু করতে পারতাম না। যার জন্যেই আসলে এই ফিল্ম মেকিংয়ে আসা। হ্যাঁ, প্রথাগত পপুলিজমের দিকে না গিয়ে একটু ডিফারেন্ট গল্প বলা কেন? ওটা হচ্ছে যেটা ঋত্বিক ঘটক বলেছেন, সেই তাড়না থেকে। অবশ্যই কোথাও না কোথাও আমার বারবার মনে হয়, এই দেশের মানুষের গল্পটা যেন উঠে আসে। এন্ড আমি সবসময় বিশ্বাস করি শিল্পীর কাজ হচ্ছে বাউন্ডারিটাকে বড় করা। সো, এই তাড়ানাটা আমার মধ্যে সবসময় কাজ করে যে, বাউন্ডারি বড় করা। যেভাবে হোক বাউন্ডারিটাকে যেন বড় করি। আমরা যেন একটা মুক্ত সমাজ তৈরি করতে পারি। এটা, এই তাড়নাটা সবসময় থাকে।
বীথি: আশফাক নিপুন আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের সঙ্গে সময় দেওয়ার জন্য।
নিপুন: থ্যাংক ইউ সো মাচ, আমার বেশ ভালো লাগলো, আমি হয়তো অনেক অনেক কথা বলেছি, আমি এক্সাইটেড হলে অনেক কথা বলি। সো, খুব ভালো লেগেছে কথা বলে। নেত্র নিউজের যারা আছেন তারা তো সবাই আমার প্রিয়, নেত্র নিউজের দর্শকদের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা। আশা করি সামনের দিনগুলো বেশ ভালো যাবে।●