২০২৫ সালে বাংলাদেশ: সবচেয়ে প্রভাবশালী দশ

এ বছরে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখা ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বছরটিকে ফিরে দেখা।

২০২৫ সালে বাংলাদেশ: সবচেয়ে প্রভাবশালী দশ
অলঙ্করণ: সুবিনয় মুস্তফী ইরন/নেত্র নিউজ

শেষ ২০২৫ সাল। সময় এসেছে বছরজুড়ে সবচেয়ে প্রভাব যারা রেখেছেন, তাদের স্মরণ করার। গত বছরের মতোই, এবারের তালিকার সবাই যে সেরা বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা নয়। কিংবা তাদের প্রভাব সবক্ষেত্রে ইতিবাচক বা ফলপ্রসূ, এমন দাবিও করা হচ্ছে না। বাংলাদেশ এখন এগোচ্ছে একটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ নির্বাচনের দিকে। এমন সময়ে যারা ২০২৫ সালকে গড়ে দিয়েছেন তাদের মধ্য দিয়েই ফিরে দেখা যাক বিদায়ী বছরটিকে।

Header Example

দশ: নারী সংস্কার কমিশন ও নারী মৈত্রী যাত্রা

বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা যেহেতু দীর্ঘদিন ধরেই নারীদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন, তাই আশা ছিল যে, এবার নারীরা তাদের ন্যায্য স্বীকৃতি পাবেন। কিন্তু তার বদলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজনৈতিক পরিসর থেকে নারীদের সরিয়ে ফেলা ও সামাজিক পর্যায়েও তাদেরকে নানাভাবে হেনস্তা হতে দেখা গেল। প্রকাশ্য নারী-বিদ্বেষের জনসমুদ্রে সরকার যখন তাদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হলো, তখন নারী সংস্কার কমিশন মর্যাদা ও ক্রোধের সঙ্গে এই অপমান সহ্য করেছে। দেশে নারীদের যে নিপীড়িত অবস্থান, তার বিপরীতে দৃঢ়তা উদযাপনের এক অভূতপূর্ব নজির রাখেন তারা। ১৬ মে নারীরা দলে দলে জড়ো হয়ে মৈত্রী যাত্রায় অংশ নেন। সংসদ ভবনের সামনে ঢাকার রাজপথ শান্তিপূর্ণভাবে দখল করেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপেক্ষায় শূন্য পড়ে থাকা জাতীয় সংসদ ভবনের বাইরে যখন এই সমাবেশ থিতু হয়, তখন তা ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর উদ্দেশে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠায়, যেন বর্তমান সরকারের মত তারা নারীদের প্রত্যাশা ভঙ্গ না করেন।

Header Example

নয়: মাহেরিন চৌধুরী

“ওরাও তো আমার সন্তান। ওরা পুড়ছে। ওদের একা রেখে আমি কী করে চলে আসি?” ২১ জুলাই মাইলস্টোন কলেজে বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর, যখন তার স্বামী তাকে সেখান থেকে সরে যেতে অনুরোধ করছিলেন, তখন মাহেরিন চৌধুরী এ কথাগুলো তাকে বলেছিলেন। বিদ্যালয়টিতে তখন আগুনে জ্বলছিল, আর সেই আগুনের দিকেই এগিয়ে গেলেন এই শিক্ষক। একাধিক প্রাণ বাঁচান তিনি। নিশ্চিত করেন মৃতদের তালিকায় তার শিক্ষার্থীদের নাম যেন আর না বাড়ে। তা করতে গিয়ে ২৩ জুলাই সেই অতিদীর্ঘ তালিকায় নিজেরও নাম লেখান মাহেরিন। শহিদগাথাকে রোমান্টিকতার মোড়কে পেঁচিয়ে রাখতে অভ্যস্ত এই দেশে, তার এই চূড়ান্ত আত্মত্যাগ আমাদের মানবিকতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হয়ে থাকবে।

Header Example

আট: হামজা চৌধুরী

ব্রিটিশরা পুরো বিশ্বজুড়ে লুটতরাজ চালাতে চালাতে ছড়িয়ে দিতে থাকে ফুটবল নামে খেলাটি। পরবর্তীতে দেখা গেলো, গোটা বিশ্বই তাদেরকে বলে লাথি মারার এই খেলায় দেদারসে হারাতে থাকে। যদিও তখনো তারা তাদের লুটের সম্পদ ফেরত দিতে নারাজ। তবে এবার ইংল্যান্ড যেন তাদের এক শ্রেষ্ঠ সম্পদ – এফএ কাপজয়ী, প্রিমিয়ার লিগে অভিজ্ঞ, ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে খেলা এক ফুটবলারকে ফিরিয়ে দিল তার নিজের দেশে। যদি হামজা চৌধুরীকে গণ্য করা হয় ক্রীড়াজগতের পার্থেনন ভাস্কর্য হিসেবে, তবে তার সুখকর সমাপ্তির কারণ হবে যে, তিনি নিজের মাতৃভূমির হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি গণমানুষের এই খেলাটিকে আবার বাংলার জনমানসে জাগিয়ে তুলেছেন এবং পুরো বিশ্বে বাংলাদেশের একজন মুখপাত্র হয়ে উঠেছেন।

Header Example

সাত: মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের পুরনো হর্তাকর্তাদের অনেকের গায়ে এখনও কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কালিমা লেগে রয়েছে। মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সেই কালিমা মুছে ফেলতে পেরেছেন। রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা না করে যোগ্য ব্যক্তিকে দক্ষতা প্রয়োগের সুযোগ দিলে কী হতে পারে, তার উদাহরণ রেখে তিনি এমন এক অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণ করেছেন, যে সরকার নিজেই শিল্প-সংস্কৃতির ওপর হামলাকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এসেছে। তারই সহকর্মীরা যখন বৈচিত্র্যের বিরুদ্ধে লড়েছেন, তিনি তখন বৈচিত্র্যকে উদ্‌যাপন করেছেন। এছাড়াও আওয়ামী লীগ শাসনামলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রামাণ্য তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে সংরক্ষণ করেছেন।

Header Example

ছয়: গুম-সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশন

গত বছর তালিকার চার নম্বরে থাকা গুম-সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সদস্যরা আজও এ দেশের সবচেয়ে সাহসী মানুষদের মধ্যে কয়েকজন। তারা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সেনাবাহিনী, ডিজিএফআই, র‍্যাব ও পুলিশের দ্বারা সংঘটিত সবচেয়ে অমানবিক কর্মকাণ্ডগুলো নিখুঁত ও জীবন্ত বিবরণে নথিবদ্ধ করে চলেছেন। ব্যাপক আমলাতান্ত্রিক বাধা ও রাজনৈতিক চাপ আসার পরেও; দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত বলয়ের সদস্যরা তাদের অনুসন্ধানের লক্ষ্যবস্তু হওয়া সত্ত্বেও, এই কমিটি জবাবদিহিতা আদায়ের সংগ্রাম কিছুতেই থামায়নি।

Header Example

পাঁচ: তাজুল ইসলাম

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) দীর্ঘদিন ধরেই তার চিফ প্রসিকিউটরের ব্যক্তিগত জমিদারি ও রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। আওয়ামী লীগ আমলের ত্রুটিপূর্ণ ও ভীষণভাবে দলীয়করণের শিকার আইসিটির কড়া সমালোচনায় মুখর ছিলেন তৎকালীন আসামীপক্ষের আইনজীবী তাজুল ইসলাম। অথচ, ইউনুস সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে কৌঁসুলি হয়ে আজ তিনি সেই একই প্রতিষ্ঠানের প্রতিশোধপরায়ণ দমনক্ষমতার পরিপূর্ণ ব্যবহার শিখেছেন। দেশের সংস্কারহীন ও লাগামহীন এই অবস্থায়, আইসিটির যে জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার বিকৃত করার গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে, সেটাই তিনি বজায় রেখে চলেছেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, আইসিটির চোরাগলিতে তাজুল ইসলামের এই কূটচালগুলোর কারণেই আজ আওয়ামী লীগের কিছু অভিযোগ দাঁড় করানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে যেগুলোকে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়।

Header Example

চার: জাতীয় ঐকমত্য কমিশন

শুরু থেকেই ইউনূস যে সংস্কারের কথা বলে আসছিলেন, সেই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাওয়া জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের গর্বিত পুরুষেরা বছরের বেশির ভাগ সময়ই হোঁচট খেতে খেতে এগিয়েছেন। লক্ষ্যসীমা, লক্ষ্য, এবং পদ-পদবি, সবই তারা বদলেছেন। অবশেষে তারা একটি আধাখেঁচড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, একটি গণভোট হবে। সেই গণভোটের প্রক্রিয়া বা তাৎপর্য অবশ্য কারোরই বোধগম্য হচ্ছে না। যেসব বিষয়ে তাদের ঐকমত্যে পৌঁছানোর কথা ছিল— বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম, নারী, সংখ্যালঘু, সেসব বিষয়ে ঐকমত্যের অভাব ঠিক তাদের ব্যর্থতার মতই জ্বলজ্বল করে চোখে পড়ে। অবশ্য এখনো তারা দমে যাননি। সদর্পে তারা বাংলাদেশের ওপর নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়ার নতুন নতুন কৌশল তৈরি করে চলেছেন।

Header Example

তিন: তারেক রহমান ও তার দুই সহযোদ্ধা

বাংলাদেশে তারেক রহমানের সুপরিকল্পিত, বহু প্রতীক্ষিত প্রত্যাবর্তন বিএনপির পালে হাওয়া জুগিয়েছে তো বটেই; তবে এর প্রভাব মূলত আগের ঘটনাক্রমের ধারাবাহিকতাকেই অনুসরণ করে। গত বছর তালিকার সাত নম্বরে থাকা তারেক রহমান তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী জেবুসহ যখন লন্ডনের স্টাডি রুমের কম্পিউটারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাচ্ছিলেন, তখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছান সালাহউদ্দিন আহমেদ ও মাহদি আমিন। সুসংহত থাকার বিশেষ নজির এই দলটির ইতিহাসে না থাকা সত্ত্বেও, তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দলটিকে পুরোপুরি বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। আদর্শিকভাবে শূন্যে ভাসমান দলটিকে স্পষ্টতই উদারনীতির দিকে টেনে এনেছে। ঐকমত্য আলোচনায় ও নির্বাচনের দীর্ঘ অপেক্ষায় তারা যে কৌশল ও ধৈর্য দেখিয়েছে, তাতে সম্ভাবনার আভাস আছে। পুরোনো চর্চায় ফিরে না গিয়ে সেই সম্ভাবনা তারা বাস্তবায়ন করতে পারবেন কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ও সুস্থ ধারার জন্ম হবে কি না।

Header Example

দুই: শরিফ ওসমান হাদি

১২ ডিসেম্বর প্রকাশ্য দিবালোকে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান এক উদীয়মান রাজনীতিক ও সংসদ সদস্য প্রার্থী। অকালেই থেমে যায় এক সম্ভাবনাময় জীবনের স্পন্দন। শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন শক্তি, উদ্দীপনা ও স্পষ্টভাষিতায় ভরপুর এক নবীন, যার ছিল মানুষকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা এবং নিজের মতাদর্শের পক্ষে লড়াই করার স্পৃহা। তার হত্যাকাণ্ড তাকে জাতীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। তাকে রক্ষা করার ব্যর্থতা ঢাকতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে শহীদ হিসেবে মহিমান্বিত করেছে। এর ফলে হাদির প্রচারিত মুসলিম জাতীয়তাবাদ আরও সংহত হয়েছে। রাজনৈতিক দক্ষিণপন্থীদের জন্য একটি পাটাতনও তৈরি হয়েছে। ভারত নিয়ে হাদির নিজস্ব সোচ্চার অবস্থান থাকায় এবং হাদির সন্দেহভাজন খুনিরা ভারতে পালিয়ে যেতে পারায় বাংলাদেশ-জুড়ে ভারতবিরোধী মনোভাব আগুনের ফুলকি থেকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।

Header Example

এক: দঙ্গল (মব)

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইউনূস সরকারের সবচেয়ে বড় অবদান হলো দঙ্গলবাজি। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বসম্পন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন স্থাপনা, মাজার-দরগাহ, সংবাদপত্রের দপ্তর ধ্বংস করা থেকে শুরু করে সংখ্যালঘুদের বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা, কবরস্থান ও নারীর শরীরের ওপর হামলা — যখনই এরকম কোনো কাজ সম্পন্ন করার প্রয়োজন পড়েছে, তখনই উত্তেজিত পুরুষদের দল হাজির হয়েছে। এদের অনেককেই বিদেশ থেকে উসকানি দেওয়া হয়েছে, আর তারা ঠাণ্ডা মাথায় দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। একটা স্পষ্ট চরম ডানপন্থী উন্মাদনা তাদের মধ্যে দেখা যায়। উসকানিমূলক বার্তাই এই ধ্বংসযজ্ঞে নামতে তাদের সংগঠিত করে। তাদের ভেতর কোনো শান্তিপূর্ণ অভিপ্রায় কখনোই দেখা যায়নি। বরং প্রতিবারই আগেরবারের চেয়ে আরও বেপরোয়া হয়েছে তারা। মাফিয়াতন্ত্রের মৃত্যু হয়েছে বটে। তবে এবার দঙ্গলতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক।●