ক্রিকেটের ময়দানে বাংলাদেশ-ভারতের ‘গুলিবিহীন যুদ্ধ’

বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজকে ঘিরে ক্রিকেট রাজনীতিতে আপাতত বাংলাদেশের কাছে ধরাশায়ী ভারত

ক্রিকেটের ময়দানে বাংলাদেশ-ভারতের ‘গুলিবিহীন যুদ্ধ’
অলঙ্করণ: নেত্র নিউজ

পৃথিবীতে নানা ধরনের মিথ্যা কথা অপ্তবাক্য হিসেবে জনপ্রিয়। তবে একটি অপ্তবাক্য এতোটাই মিথ্যা যে, তা রীতিমত হাস্যকর। বাক্যটি হচ্ছে— খেলাধুলার সাথে রাজনীতি মেশাবেন না। বিরাজনীতিকরণের অদ্ভূত উন্নাসিকতা থেকে উৎসারিত বাক্যটি যারা বিশ্বাস করেন, তারা ভুলে যান যে, আন্তর্জাতিক খেলা মানেই রাজনীতি। শুধু রাজনীতিই নয়, কেউ কেউ মনে করেন, হাজার হাজার বছর ধরে দেশ দখল ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের লক্ষে দেশে দেশে যে যুদ্ধ হতো, তার আধুনিক রূপ হচ্ছে আন্তর্জাতিক খেলাধুলা। অস্ত্র হাতে প্রতিপক্ষকে নিকেশ করার যে শিকারী প্রবণতা, খেলার মাঠে তা অবদমন করা হয় মাত্র। আধুনিক যুগে মরণঘাতী যুদ্ধের অভাব রাষ্ট্রগুলো খেলার ময়দানে পূরণ করে নেয়। এ কারণেই জর্জ ওরওয়েল আন্তর্জাতিক খেলাধুলাকে বলেছিলেন, ‘ওয়ার মাইনাস দ্য শুটিং’। আর সেই নাম ধার করে মার্কিন ক্রীড়ালেখক মাইক মারকুইসি একই শিরোনামে একটা বই লিখে ফেলেন। বইটির বিষয়বস্তু, ১৯৯৬ সালে উপমহাদেশে হওয়া ক্রিকেট বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে খেলাধুলার রাজনীতি, কূটনীতি এবং এর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়াসহ গোটা ক্রিকেট বিশ্বের রাজনীতি।

 ঠিক ৩০ বছর পর, উপমহাদেশে আরো একটি বিশ্বকাপের প্রাক্কালে ক্রিকেট কূটনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে দুই প্রতিবেশী— বাংলাদেশ ও ভারত। এই ঘটনার নানাদিক বিশ্লেষণ করে আমরা মার্কুইসির মতো এই অঞ্চলের ক্রিকেট রাজনীতিই শুধু নয়, দুই দেশের সম্পর্ক এবং আরো নানা বিষয় নিয়ে বৃহৎ পরিসরে আলোচনা করতে পারি।

 ঘটনার বিস্ফোরণ ঘটে বাংলাদেশের খেলোয়াড় মুস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে। ৯ কোটি রুপির বেশিতে তাকে দলে ভেড়ালেও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের হস্তক্ষপে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগের (আইপিএল) দল কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)। বোর্ডের তরফ থেকে বলা হয় যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মুস্তাফিজকে দলে রাখা যাবে না। এর পেছনের কারণ, ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির এক নেতা হুমকি দিয়ে বলেন যে, মুস্তাফিজ আইপিএলে খেললে তারা কেকেআরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। সেইসঙ্গে কেকেআরের মালিক, ভারতের সুপারস্টার শাহরুখ খানকে দালাল বলে আখ্যা দেন এবং দেশ থেকে বহিস্কারের হুমকি দেন। 

এখানে উল্লেখ্য যে, শাহরুখ ভারতের মেগাস্টার হলেও তিনি মুসলমান। মুস্তাফিজও তাই। আর বিজেপির জমানায় গরুর মাংস ফ্রিজে রাখার মতো তুচ্ছ ঘটনা থেকে শুরু করে বাংলাদেশি সন্দেহে বহু মুসলমানকে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যার নজির আছে। ভারতে হিন্দুত্ববাদী শাসনে অনিরাপদ জীবনযাপন করছেন অহিন্দুরা। চলছে এক ভয়ংকর জাতিবিদ্বেষ ও একের পর এক হত্যাকাণ্ড।

তবে, সেই বিজেপিরই দাবি হচ্ছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক সময়ের জন্য স্বৈরশাসন চালানো হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নিপীড়ন চলছে। সে দেশের গণমাধ্যেমে রীতিমত অপতথ্যের মচ্ছব করে জানানো হচ্ছে যে, বাংলাদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে চালানো হচ্ছে গণহত্যা। পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধাবস্থায় থাকা দেশটিতে বাংলাদেশ নিয়েও প্রায় একই রকম সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে বিজেপি ও অন্যরা। দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে উত্তেজনা ও ঘৃণা ছড়িয়ে হিন্দুত্ববাদের পালে হাওয়া আরো জোরদার করা হচ্ছে।

একথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশে বিগত দেড় বছর ধরে অস্থিরতা চলছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অক্ষমতা এবং প্রছন্ন ইঙ্গিতে এ দেশে প্রচুর মাজার ভাঙচুর হয়েছে মব আক্রমণের নামে। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে অনেক অমুসলিমদের জানমালের উপর হামলা হয়েছে। তবে, বিজেপির মতো ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিশানা করে বিপুল মাত্রায় জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে না।

তবে, স্বৈরশাসক হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া বিজেপি সরকার এমন পরিস্থিতিকে যত বেশি সম্ভব বিদ্বেষপূর্ণ করতে চায়। হাসিনার পতনের পর থেকেই বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা কঠোর করা হয়েছে। কূটনৈতিক পর্যায়ে শিথিলতা চলছে। মোদির আমলে অবশ্য এক তালিবান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার আর প্রায় সব দেশের সাথেই ভারতের সম্পর্ক শীতল। আর ক্রিকেটবিশ্বে প্রায় এককভাবে ছড়ি ঘোরানো ভারত অন্যদের থোড়াই কেয়ার করে। আমরাই ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি অর্থের যোগানদাতা— এই অহংকারের সাথে মোদিযুগের আক্রমনাত্মক কুটনীতি ক্রিকেটবিশ্বের রাজনীতির গতিপথও নির্ধারণ করছে।

মুস্তাফিজের ঘটনায় ভারত সরকার যা করলো তা এই অতি আক্রমণাত্মক ও অন্যদের তুচ্ছ করার ঔদ্ধত্যপূর্ণ মানসিকতা থেকে করেছে। এবং তা করতে গিয়ে তারা ভুলে গেল যে, এর প্রতিউত্তর আসতে পারে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টা চরম সুযোগ হয়ে আসলো এই কারণে যে, মাসখানেক পরেই ভারতে টি২০ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আর বাংলাদেশ তাই যৌক্তিকভাবেই বললো, যে দেশ আমাদের একজন খেলোয়াড়কেই নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেখানে গোটা দলের কী হবে? কী হবে বিশ্বকাপে যাওয়া সাংবাদিক আর অগণিত দর্শকদের? বাংলাদেশ দাবী করলো, পাকিস্তানের জন্য যদি শ্রীলংকায় বিশেষ ব্যবস্থা করা যেতে পারে, আমাদের জন্যও তাই করতে হবে। আর না হলে, আমরা খেলবোই না।

এরকম দাবি নতুন না। শুরুতেই যে ৯৬ বিশ্বকাপের কথা বললাম, সেবার শ্রীলংকায় নিরাপত্তার অজুহাতে খেলতে যায়নি অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড জিম্বাবুয়েতে এবং নিউজিল্যান্ড কেনিয়াতে খেলতে যায়নি। ২০০৯ টিটুয়েন্টি বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। ২০১৬ সালের যুব বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে খেলতে আসেনি, যদিও এর কিছুদিন আগে অস্ট্রেলিয়া ফুটবল দল বাংলাদেশে আসে বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব খেলতে। এই শেষ ঘটনাটা আইসিসি আর ফিফার পার্থক্য বুঝিয়ে দেয়। ফিফার নামে অনেক দুর্নীতির অভিযোগ আছে ঠিকই, তবে তারা অনেক শক্ত অবস্থান নিতে পারে। অন্যদিকে, আইসিসি অনেকটাই মেরুদণ্ডহীন। এ কারণে দেখা যায়, আইসিসি তিন মোড়ল তত্ত্ব দিয়ে ভারত, ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়াকে সুবিধা দেয়। ভারতের আপত্তির কারণে যে টুর্নামেন্টে পাকিস্তান থাকে সেখানে হাইব্রিড নামক অদ্ভুত এক মডেলে খেলা চালানো হয়। যদিও, পাকিস্তানকে ২০২৩ সালের বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যেতে বাধ্য করা হয়।

তবে, আগের বিশ্বকাপগুলোর সাথে এবারের পার্থক্য হচ্ছে, ভারত সরকার ইতিমধ্যেই হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে নতজানু অবস্থান নিয়েছে। ১৯৯১ সালে পাকিস্তান ভারতে খেলতে গেলে খেলার কিছুদিন আগে নয়াদিল্লীর ফিরোজ শাহ কোটালার পিচ ভেঙ্গে দিয়ে এসেছিলো বিজেপি নেতা বাল থ্যাকারের গুণ্ডারা। ভারতও পাকিস্তানে খেলতে গেলে কিছু হুমকি পেয়েছিলো। এইসব আওয়াজ উঠেই। কিন্তু মুস্তাফিজের ক্ষেত্রে এই গোষ্ঠীর হুমকিতে দাবি মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে সরকারের অক্ষমতা বা ইচ্ছারই ইঙ্গিত পাওয়া গেলো। ফলে, বাংলাদেশের পক্ষে ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ নেই।

তবে, ভারত ভাবতেই পারেনি বাংলাদেশ বিশ্বকাপ বয়কট করতে পারে। বিষয়টা এমন হবে জানলে হয়তো মুস্তাফিজের ব্যাপারটা বিশ্বকাপের পরে উত্থাপিত হতো। কারণ, আইপিএল শুরু হবে বিশ্বকাপের পরে। তখন মুস্তাফিজকে অপমান করলে বাংলাদেশের তেমন কিছু করার থাকতো না। 

ভারত কি ব্যাপারটা বোঝেনি? নাকি আসলে পুরাটাই আরো বড় রাজনীতি? মাথায় রাখতে হবে যে, মার্চ-এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠত হচ্ছে। একদা এই রাজ্যে অনুপস্থিত থাকা বিজেপির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন রাজ্যটিতে নির্বাচনে জেতা। তাদের জন্য এই মুহূর্তে বাংলাদেশ বিরোধিতার চেয়ে বড় কার্ড আর কী হতে পারে! ক্রিকেট আর ধর্ম— এই দুই-ই যদি কার্ড হিসেবে কাজে লাগানো যায় তবে ভারতের রাজনীতিতে তো তাদের জন্য পোয়াবারো। 

প্রশ্ন উঠে, মুস্তাফিজ যদি কলকাতার দলে না খেলে অন্য কোনো অঞ্চলের দলে খেলতেন, তবে এইরকম আওয়াজ উঠতো? বলা কঠিন। তবে রাজনীতি খুব সুক্ষ্ম চালের খেলা। যদিও এই লোকরঞ্জনবাদের রমরমা পোস্ট ট্রুথের যুগে মানুষকে জম্বির মতো ঘৃণা করতে শেখাতে পারলেই রাজনীতিবিদদের জয় হয়। মোদি বা ট্রাম্পের জয়জয়কার এর বড় প্রমাণ।

“দিল্লী না ঢাকা” স্লোগানে যে পরিমাণ জজবা থাকে এর কিয়দাংশ থাকে না প্রকৃত রাজনীতিতে। বাংলাদেশের অর্থনীতি কীভাবে স্বনির্ভর হবে, ভারতের ওপর এতদিনের যে নির্ভরতা তৈরি করা হয়েছে, তা থেকে কীভাবে মুক্ত হওয়া যাবে, এ নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা দেখা যাচ্ছে না। পাট ও বস্ত্রশিল্প থেকে শুরু করে দেশের প্রায় কোনো সেক্টরেই রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ দৃশ্যমান নয়। ভারতের সাথে সম্পর্ক কতটা সমতার ও ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে হবে তা নিয়ে পররাষ্ট্রনীতির কোনো আলামত নেই। আছে কেবল রেটোরিক আর রেটোরিক

অথচ, অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি-প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকর ঢাকায় এসেছিলেন। সাক্ষাৎ করেছেন খালেদাপুত্র এবং বিএনপির নতুন প্রধান তারেক রহমানের সাথে। এই ঘটনায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ভারত বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ইচ্ছুক। তবে সেটা ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পাশ কাটিয়ে পরের সরকারের সঙ্গেই করতে চায়— এমনই হাবভাব ভারতের।

সাধারণ বিচারে তা-ই করা উচিত। দুটি প্রতিবেশী দেশের জন্য এরকম শীতল সম্পর্ক স্বাস্থ্যকর নয়। তবে, বাংলাদেশের তরফে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এবং আশঙ্কা আছে। ভারত বরাবরই এদেশে পাপেট সরকার বসাতে চেয়েছে। হাসিনার শাসনামল অনেকটা তা-ই ছিল। গণঅভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া হাসিনাকে সে দেশে আশ্রয় দিয়ে তার প্রভুভক্তির প্রতিদানও দিয়েছে ভারত। ফলত, বাংলাদেশের ক্ষমতায় যে-ই আসুক, তাকে ভারত বিষয়ে সাবধান হতে হবে। বৃহৎ ও আগ্রাসী প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে ছোট দেশের জন্য এ এক নিরন্তর সংগ্রাম।

কিন্তু, মুশকিল হচ্ছে, লোকরঞ্জনবাদের এই যুগে রেটোরিক আর উত্তেজনাই রাজনীতির বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সেই জোয়ার বাংলাদেশেও। “দিল্লী না ঢাকা” স্লোগানে যে পরিমাণ জজবা থাকে এর কিয়দাংশ থাকে না প্রকৃত রাজনীতিতে। বাংলাদেশের অর্থনীতি কীভাবে স্বনির্ভর হবে, ভারতের ওপর এতদিনের যে নির্ভরতা তৈরি করা হয়েছে, তা থেকে কীভাবে মুক্ত হওয়া যাবে, এ নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা দেখা যাচ্ছে না। পাট ও বস্ত্রশিল্প থেকে শুরু করে দেশের প্রায় কোনো সেক্টরেই রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ দৃশ্যমান নয়। ভারতের সাথে সম্পর্ক কতটা সমতার ও ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে হবে তা নিয়ে পররাষ্ট্রনীতির কোনো আলামত নেই। আছে কেবল রেটোরিক আর রেটোরিক।

অর্থনীতিবিদ মাহা মির্জা এক কলামে এ নিয়ে আলাপ তুলেছেন— “ভারতের সঙ্গে হাসিনার নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, বিএসএফের সীমান্ত হত্যা, ফেলানী হত্যা, জ্বালানি খাতে আদানির আধিপত্যবাদী চুক্তি, তিস্তার পানি বণ্টন, অন্যায্য ট্রানজিট চুক্তি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ভারতের নিম্নমানের কয়লার ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ডে’ পরিণত করা— এসব অন্যায্য বন্দোবস্ত মোকাবিলা করতে হলে অর্থনীতির একটা স্বনির্ভর ভিত্তি লাগে। জাতীয় সক্ষমতা লাগে। ভারত-নির্ভরশীলতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদী পলিসি লাগে। অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিল্লির হাতে তুলে দিয়ে মুখে “ঢাকা ঢাকা” বললে জনতুষ্টিবাদের রাজনীতি হয়, আধিপত্যবাদ ঠেকানো যায় না।“ 

ফিরে আসি ক্রিকেট কূটনীতিতে। ক্রিকেট খেলার মতো কূটনীতিতেও সে-ই ভালো খেলোয়াড়, যে জানে দলের টার্গেট কত এবং সে অনুযায়ী গেম প্ল্যান সাজায়। একটা লুজ বলে ছক্কা হাঁকানোর জোশে পরের বলটাকে যে বিবেচনাবোধ না খাটিয়ে খেলতে যায়, সে ভালো ব্যাটার না। মহাপরাক্রমশালী ভারত লুজ বল দিয়েছে, বাংলাদেশ যুতসইভাবে ছয় মেরেছে। এর পরে কী হবে?

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে যে, ভারতের গুণ্ডামির জবাব মুখের উপর দেওয়া যায়। মিডিয়ার ভাষ্য অনুসারে, ভারতও নিজের থুতু গেলার জন্য প্রস্তুত ছিল। এমনকি মুস্তাফিজকে আইপিএলে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবও নাকি ছিল।

গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড নিয়মতান্ত্রিকভাবেই এগোতে চেয়েছিলো। প্রথমে বিসিসিআইয়ের কাছে জানতে চায় যে, তাদের নিরাপত্তা প্রটোকল কী? তাতে সন্তুষ্ট না হলে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল পাঠাতো এবং হয়তো ভারত ও আইসিসির বাইরে নিজেদের সুরক্ষা দলও পাঠাতো। এই ব্যাপারটা আয়োজক দেশ, বিশেষ করে ভারতের মতো পরাশক্তির জন্য বেশ অস্বস্তিকর হতো। তবে, তার আগেই বাংলাদেশ সরকার আক্রমনাত্মক অবস্থান নেয়।

বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে দেখলে এই সুযোগটা পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনার মতো। একদিকে মববাজী অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ব্যর্থ সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কার্ড ভারতবিরোধিতা, আরো স্পষ্ট করে বললে ভারতবিরোধী রেটোরিক। আর, যেহেতু এই সরকার মাস দুয়েকের বেশি থাকছে না, ফলে নিজেদের স্কোর বাড়িয়ে পরের সরকারের জন্য কূটনীতি কঠিন করে তোলা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই।

কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতের সাথে আপাত কূটনীতির লক্ষ্য কী? এক্সিট প্ল্যান কী? বাংলাদেশ কি ভারতের সাথে সব রকম সম্পর্ক বন্ধ করে দেবে? নাকি ভারতের সাথে দরকষাকষি করে নিজেদের হিস্যা ও সম্মান বুঝে নেবে, যা দক্ষ কূটনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়কেরা নিশ্চিত করেন?

বাংলাদেশের দিক থেকে সবচেয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ হতো ভারতের ভুলকে কাজে লাগানো। দরকষাকষি করা। ভারতকে বলে আরো কয়েকটা সফরের ব্যাবস্থা করা, আইসিসিতে প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের রেভিনিউ বাড়ানো। মনে রাখতে হবে, ক্রিকেট কূটনীতি ব্লক নির্ভর হয়। পাকিস্তানের পর বাংলাদেশের সাথেও বৈরিতা ভারতের জন্য ভালো সংবাদ হবে না, তাতে মোদির দলের যতো লাভই হোক।

সেই ১৯৯৬ সালে যখন অ-এশীয় ব্লক শ্রীলংকা বয়কট করে সেসময় আজহারউদ্দিন আর ইমরান খানের যৌথ নেতৃত্বে একটা দল শ্রীলংকা গিয়ে প্রীতিম্যাচ খেলে। বিশ্বকাপের ব্যাস্ত সূচিতেও এই খেলাটা জোর দিয়ে বুঝিয়ে দেয় যে, ক্রিকেট দুনিয়ায় এশিয়ার শক্তি কতোটা বেশি। নিজেদের মধ্যে ঝামেলা থাকলেও আঞ্চলিক স্বার্থে তারা সুসংহত। এই শক্তির জোরে প্রথমে বাংলাদেশ, এরপর আফগানিস্তান টেস্ট স্ট্যাটাস পায়। এমন কি নেপালের মতো দলও উঠে আসছে। কিন্তু রাজনৈতিক ব্লকের শক্তি না থাকায় একদা বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল খেলা কেনিয়া হারিয়ে গেছে। বহুদিনের ক্রিকেট ঐতিহ্য থাকা আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, স্কটল্যান্ডরা খুব বেশি এগোয়নি। আর আর্জেন্টিনা বা কানাডার মতো দেশ যে একদা ক্রিকেট খেলতো, তা তো লোকে ভুলেই গেছে।

ফলে, বাংলাদেশ ও ভারত উভয়কেই কূটনৈতিক স্বার্থে সজাগ হতে হবে। বাংলাদেশের জন্য একটা বার্তা দেওয়ার সুযোগ নিতে গেলে শুধু ক্রিকেট নয়, তিস্তার পানি বণ্টন, ফারাক্কা, সীমান্তহত্যা— এগুলো নিয়েও সর্তক হতে হবে ভারতকে। বাংলাদেশকে ন্যায্য হিস্যা দিতে হবে। এই ব্যাপারটা নিশ্চিত করতে সার্কের মতো সংগঠনের পুনর্জাগরণেও আন্তরিক হতে হবে।

কুটনীতি ঠাণ্ডা মাথার রাজনীতি। এখানে প্রতিপক্ষের সাথে চোখে চোখ রেখে সম্মান অর্জন করে নিতে হয়, আবার ছাড় দিতেও শিখতে হয়। বাংলাদেশ হচ্ছে পুকুরের ছোট মাছ। বড় মাছের সাথে খেলতে হলে এই মাছকে কৌশলী হতে হবে, একতাবদ্ধ এবং বাস্তববাদী রিয়েল পলিটিকের চর্চা করতে হবে।

তবে, ওপারের বিজেপি আর এপারের ঘৃণাবাদীরা রিয়েল পলিটিকে আগ্রহী নয়। তারা চায়, ধর্ম আর নানারকম চেতনার কার্ড খেলে উত্তেজনা জিইয়ে রাখতে। মানুষকে তাতিয়ে তুলে নিজেদের ভোটের বাক্স আর ক্ষমতাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখাতে।

বাংলাদেশ একটা ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আছে। ভারতের সাথে দীর্ঘকালের একপেশে সম্পর্ক, নতজানু অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এই দেশের মানুষ মুখিয়ে আছে। ফলত, কোনো ধরনের দুর্বল অবস্থান মানুষ সহ্য করবে না। তবে, এই অবস্থাতেও ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে হবে।

একটা বিশ্বকাপ খেলতে না গেলে বাংলাদেশের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। বরং এই সময় শক্ত অবস্থান বাংলাদেশকে একটা মানসিক ও নৈতিক শক্তি দেবে। কিন্তু, সেইসাথে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, দাবার চালের মতো, ক্রিকেটের রান চেজের মতো এর পরের চালগুলো কী হয়।

ভারতের সাথে কি বাংলাদেশ যুদ্ধ চায়? সবধরনের সম্পর্ক বন্ধ করে দিতে চায়? সেটা হলে ক্ষতি হবে দুই দেশের মানুষের। লাভ হবে যুদ্ধবাজ আর ঘৃণাবাদীদের। বরং দরকার সমতার কূটনীতি। সম্মান নিশ্চিতকরণের রাজনীতি। 

বাংলাদেশের নিজেদের ক্রিকেটটা গোছাতে হবে। কেবলমাত্র ওভারহাইপড ন্যাশনালিজম বা উগ্র জাতীয়তাবাদের হাতিয়ার না হয়ে একে সত্যি সত্যি ধারালো করতে হবে। বিশ কোটি লোকের দেশের বাজারের যে শক্তি, তা অর্জন করতে হবে। কিন্তু মুস্তাফিজের এই ঘটনা থেকে পাওয়া শক্তি কি আদৌ বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারবে? ক্রিকেট ছাপিয়ে দেশের অর্থনীতি আর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও কি সে প্রেরণা বহাল থাকবে? 

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী কবি রুডইয়ার্ড কিপলিং বলেছিলেন, “হোয়্যাট শ্যুড দে নো অফ ইংল্যান্ড হু অনলি ইংল্যান্ড নো?” শুধু ইংল্যান্ডকে জানলেই কি ইংরেজ সাম্রাজ্য বোঝা যায়? এই কথার অনুকরণে গত শতকের অন্যতম সেরা দার্শনিক, ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা বই ‘বিয়ন্ড এ বাউন্ডারি’র লেখক সিএলআর জেমস বলেছিলেন, “হোয়্যাট ডু দে নো অফ ক্রিকেট হু অনলি ক্রিকেট নো”? অর্থাৎ, কেবল স্কোর, রান, অ্যাভারেজ, ইত্যাদি মিলে ক্রিকেট নয়; ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ, শ্রেণি ও রাজনীতি না বুঝলে ক্রিকেট বোঝা যাবে না।

ক্রিকেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হাতিয়ার। সন্দেহ নেই, ক্রিকেটে বাংলাদেশের তেমন অর্জন নেই। প্রায় পুরোটাই আদতে রাজনৈতিক সংযোগে পাওয়া। কিন্তু, মজার ব্যাপার হচ্ছে, ক্রিকেট মূলত ফোলানো জাতীয়তাবাদের বেলুন হলেও, একে ঘিরে সত্যিকারের পরিবর্তন সম্ভব। বাংলাদেশের পক্ষে ন্যায্যতার লড়াইয়ের সত্যিকারের শুরু হতে পারে এই ক্রিকেট থেকেই।●

সৈয়দ ফায়েজ আহমেদ একজন লেখক, অনুবাদক ও কলামিস্ট।