সংবিধান নারীদের সমতা এক হাত দিয়ে দিয়েছে, আরেক হাত দিয়ে নিয়ে গেছে: শিরিন পারভীন হক
বাংলাদেশের বাস্তবতায় নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে নেত্র নিউজের 'মুখোমুখি' হয়েছিলেন শিরিন পারভীন হক।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষে বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার একটি নারী সংস্কার কমিশন। এর প্রধান নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও নারী অধিকারকর্মী শিরীন পারভীন হক। তার কমিশনসহ অন্যান্য কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের “সদিচ্ছা’ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারী অধিকারের নানা প্রস্তাবনাও কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে তা নিয়ে কথা বলেছেন নেত্র নিউজের সঙ্গে। তার সঙ্গে ছিলেন সুরাইয়া সুলতানা (বীথি) [সাক্ষাৎকারটি রেকর্ড হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে]
বীথি: সম্প্রতি আমরা দেখেছি নারী সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে অনেক প্রতিক্রিয়া হলো, বিভিন্ন পক্ষ থেকে। আপনারা তিনটি মেয়াদে ৪৪৩টি সুপারিশ দিয়েছেন এবং তিনটি আলাদা আলাদা ধাপ ছিল। আপনার কাছে জানতে চাইবো, এই যে তিনটি মেয়াদে আপনারা দিলেন, সেগুলো আসলে কী মনে করে? বা বাস্তবতায় যখন সেগুলো প্রয়োগ করা হবে তখন কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
শিরীন: তিনটি মেয়াদে সুপারিশ করার পিছনে মূল কারণটা হলো, আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, এই যে এখন যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আছে, এই সরকার তো রাজনৈতিক সরকার না এবং এই সরকার ভোট চাইতে যাবে না। সুতরাং এই সরকারের পক্ষে অনেক কিছু করা সম্ভব, যেটা রাজনৈতিক সরকার করতে তিনবার ভাববে। ভাববে যে, এটা করতে গিয়ে ভোট হারাবো কি না, ওইটা করতে গিয়ে ভোট হারাবো কি না, ইত্যাদি। তো আমাদের কাছে মনে হচ্ছে এটা আমাদের জন্য একটা ঐতিহাসিক সুযোগ, আর বিশেষ করে যখন নারী সংস্কার কমিশনে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো, তখন আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা বিশাল, ঐতিহাসিক সুযোগ, যেটাকে আমরা কাজে লাগাতে পারি যে, আমাদের এতদিনের যে চাওয়া-পাওয়া, এতদিনের বঞ্চনা, এতদিনের নির্যাতন-নিগ্রহ সবকিছু মিলিয়ে আমরা কী চাই, নারীরা কী চায়, সেটা জনপরিসরে উঠে আসবে এবং সেটা না শুধু, জনপরিসরে তো উঠে আসবেই, সেই সাথে এই যে দলিলটা, একটা সরকারি দলিলের মধ্যে সন্নিবেশিত হবে। এবং আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, এটা নারী আন্দোলনের জন্য, বিশেষ করে নারী অধিকার আন্দোলনের জন্য একটা বড় রকমের অর্জন হতে পারে। তো, আমরা সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই কিন্তু কাজ শুরু করেছি।
বীথি: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই সংস্কার করতে গিয়ে আপনি যে ধরনের হয়রানির মুখে পড়লেন, মানে অনলাইন অফলাইন দুইভাবেই… আপনার কি কখনো মনে হয়েছে যে, এখন আসলে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন?
শিরীন: এটার উত্তর কিন্তু হ্যাঁ এবং না দুইটাই। কারণ, বিভিন্ন সময় নানা রকম অন্তরায়, নানা রকম বাধা-বিপত্তির মুখে পড়তে হয়েছে। শুধু নারী পক্ষকে না নারী আন্দোলনের অন্য যারা আছে তাদেরও পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে কতগুলো বিষয় নিয়ে কথা বলা, কতগুলো বিষয়কে সামনে হাজির করার দাবি হিসেবে। সেটা নেওয়ার মতো মানসিকতা তৈরি হয়নি এখনো।
সমাজে তৈরি হয়নি এবং সেজন্য আমি কিন্তু আশ্চর্য হইনি। আমি ধরেই নিয়েছি এখানে তর্ক হবে, বিতর্ক হবে, সমালোচনা হবে, আলোচনা হবে। তারপরেও আমাদের কাছে মনে হয়েছে এগুলো সব হওয়াটাও একধরনের ইতিবাচক অগ্রগতি। কারণ, এই বিষয়গুলো জনপরিসরে আলোচিত হয় না। এই বিষয়গুলো জনপরিসরে আসে না। মানুষ জানে না নারীরা কী চায়। নারীরা তাদের জীবনের জন্য, স্বাধীনভাবে চলতে পারার জন্য, স্বাধীনভাবে বলতে পারার জন্য, নারীদের কী দরকার। সংবিধানে সমতার কথা বলা হয়েছে। এক হাত দিয়ে সমতা দিয়েছে, আরেক হাত দিয়ে সমতা নিয়ে গেছে। সেটা হয়েছে আমাদের পারিবারিক আইন… আমরা জানি আমাদের পারিবারিক আইন কিন্তু ধর্মনির্ভর। সুতরাং পারিবারিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের সকল নারী সমান অধিকার বা একই অধিকার পায় না। মুসলিম পারিবারিক আইনে এক রকম আছে, হিন্দু পারিবারিক আইনে আরেক রকম আছে। খ্রিস্টানদের জন্য আরেক রকম, বৌদ্ধদের জন্য আরেক রকম। আর যাদের কোনো ধর্মবিশ্বাস নেই তাদের অস্তিত্বই স্বীকার করা হয় না।
তো, সেজন্য আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এমন একটা জিনিস আমরা হাজির করতে চাই, যেখানে বাংলাদেশের সকল নারী, তার জাতিসত্তা যাই হোক, তার ভাষা যাই হোক, তার শ্রেণি যাই হোক, সবকিছু মিলে অন্তত আইনি অধিকারের জায়গায় তারা এক কাতারে দাঁড়াতে পারে।
বীথি: যে পরিকল্পনাগুলো ছিল আপনাদের, সে পরিকল্পনাগুলো কি অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছেন নাকি কিছুটা আপোষ করতে হয়েছে?
শিরীন: আমার কমিশনে আমরা ১০ জন। আমরা কিন্তু যা বলতে চেয়েছি সবই আমরা লিখিতভাবে রিপোর্টে দিয়েছি। আমরা সেখানে কোথাও কোনো রকমের… মানে এটা দেওয়া যাবে কি, এটা দেওয়া যাবে না… কি কি প্রতিক্রিয়া হবে, কি প্রতিক্রিয়া হবে না, ওগুলো আমরা ইয়ে (চিন্তা) করিনি।। আমরা মনে করেছি, আমরা যা বলার আমরা বলবো। এখন এটা সরকারের দায়িত্ব। এখন এটা কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে, বর্তমান সরকার (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) এবং আগামীর যে সরকার, সেটা সরকারের বিবেচনার বিষয় আছে। কিন্তু আমাদের দিক থেকে আমরা কী চাই, সেটা ভালোভাবে চিন্তা করেই আমরা দিয়েছি। সেই জায়গা থেকে প্রতিক্রিয়া যে হয়েছে সেটা কিন্তু হওয়ার কথা আসলে। কারণ, আমরা তো সে মানসিকতা এখনো তৈরি করতে পারিনি। আমার কাছে খুব খারাপ লাগে, যখন ২০২৫ সালে এসেও বলতে হয় যে, আমরা আসলে প্যারিটি চাই, আমরা আসলে ইক্যুয়ালিটি চাই, আমরা আসলে ৫০-৫০ চাই। নারী আন্দোলনেরও অনেক অংশ এখনো এক-তৃতীয়াংশে খুশি। যেমন সংসদে আসন— সংসদে আসনের ক্ষেত্রে অনেকেই বলছেন যে, ১০০টা আসন যদি নারীদের জন্য দেওয়া হয়, সংরক্ষিত আসন, তাহলে সেটাতেই আমরা খুশি। এবং সেখানে আমাদের দাবি শুধু একটা, সেটা হলো যে, সরাসরি ভোটে আসা।
আমরা বলছি কেন? যখন ৩০০ আসনের সংসদ করা হয়েছিল সেই সময় আমাদের জনসংখ্যা কত ছিল, আর এখন জনসংখ্যা কী? সেই হিসেবে তো জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যাও বাড়তে হবে। সেজন্য আমরা বলেছি যে, আমরা ৬০০ আসনের সংসদ চাই, যেখানে ৩০০ আসন সংরক্ষিত হবে। সেটাতে আবার কয়েকজন আমাকে বলেছে, তাহলে তো সাধারণ আসনেও নারীরা আসবে। তাহলে তো নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যাবে সংসদে। আমি বললাম, তো? ৫০ বছর তো পুরুষরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। এখন না হয় হলো নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আমরা দেখি না তারা দেশকে কী দিতে পারে। সে সুযোগটা একবার দিয়ে দেখি।
বীথি: সরাসরি নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিত্বের যে প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন, আদতে কি এটা ক্ষমতার পুনর্বণ্টন করবে বলে মনে করেন, নাকি আসলে নারীরা পুরুষদেরই একটা পলিটিক্যাল টুল হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
শিরীন: সেটা তো হবেই, সেটা অনেকদিন ধরে হয়েও আসছে। একসময় তো নারী আন্দোলনের যে বৃহত্তম সংগঠন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, সেটা একসময় একটা রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন ছিল। কিন্তু একটা সময় এসে তারা বোধ করেছে এবং তারা সচেতন হয়েছে যে, না, আমরা অঙ্গসংগঠন হিসেবে থাকতে চাই না। আমরা একটা স্বতন্ত্র সত্তা নিয়ে হাজির হতে চাই। সেই হিসেবে মহিলা পরিষদ কিন্তু একটা সময় এসে আলাদা হয়ে গেল। রাজনৈতিক দলের থেকে আলাদা হয়ে গেল। তারপরও রাজনৈতিক দলগুলোর তো অঙ্গসংগঠন আছে। প্রত্যেকটা দলেরই একটা নারী উইং আছে, নারী শাখা আছে। তো, তারা কতটুকু স্বতন্ত্রভাবে তাদের এজেন্ডা তৈরি করতে পারে, তাদের দাবিনামাগুলো তৈরি করতে পারে, আমি ঠিক জানি না। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা হলো, দল কী চাচ্ছে, সেটাকে সমর্থন দেওয়া। এবং দলের যে চাহিদা, সেটার পক্ষে নারীদেরকে মোবিলাইজ করা।
বীথি: এই যে সংস্কার প্রস্তাবনাগুলো দেওয়া হয়েছে, আমরা জানি বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সেখানে কিছু সংস্কার করবো করবো বলে মানুষের কাছে ভোট চাওয়া হয়। সেজন্য যত ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, সকল ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বাস্তবে কিন্তু সেগুলোর খুব একটা বেশি প্রয়োগ হতে দেখি না। আপনার কি মনে হয় রাজনৈতিক দলগুলো আসলে এই সংস্কার প্রস্তাবনাগুলোকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে?
শিরীন: পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করবে কি না জানি না। কিন্তু যেদিন আমরা জমা (প্রতিবেদন) দিলাম ১৯ এপ্রিল, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে, সেদিন জমা দেওয়ার পরপরই একটা সংবাদ সম্মেলন ছিল। আমি সেখানে বলেছিলাম যে, এই ৪৩৩টা প্রস্তাবের মধ্যে যদি দুইশটাও বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে কিন্তু নারীরা অনেকটা আগাবে। তো, আমি এক্সপেক্ট করি না যে ৪৩৩টা রাতারাতি হয়ে যাবে। তা তো হবে না। আমরা সেভাবে ভাগও করে নিয়েছি। কোনগুলো আমরা মনে করি করা সম্ভব। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থাকতে থাকতেই করা সম্ভব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যে, সেটার প্রতিও কতটুকু রাজনৈতিক ইচ্ছা আছে, আমি জানি না। রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হবে কি না, পুঁজি হবে কি না, সেটা আমি জানি না। আমি ঠিক বলতে পারছি না, সেটা কতটা হবে বা হবে না। কারণ ওই খেলাটা এখনো শুরু হয়নি।
বীথি: যারা নারী আন্দোলন নিয়ে কাজ করে গেছেন, নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে গেছেন, সেখান থেকে যদি বলি, তাহলে আন্দোলন এবং সংস্কার— মানে একটা রাষ্ট্রের বাইরে থেকে আন্দোলন করা, একটা রাষ্ট্রের ভেতর থেকে পরিবর্তনগুলো নিয়ে আসার জন্য কাজ করা, কোনটিকে আপনার কাছে টেকসই মনে হয় এবং কেন?
শিরীন: আমি মনে করি দুইটারই দরকার আছে। একটা কথা আছে ইংরেজিতে, ইন এন্ড আউট অফ স্টেটস, সুতরাং রাষ্ট্রের ভিতরে থেকেও যতটুকু সম্ভব যদি দরজাটা খোলা হয় আমাদের জন্য, আমাদের সেই সুযোগটা নেওয়া উচিত। কারণ, সেখান থেকে অনেক কিছুকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু এট দ্যা সেম টাইম বাইরে থেকে চাপটা অব্যাহত রাখতে হবে। সুতরাং আমি সবসময় মনে করি আমাদের আন্দোলনের জায়গা রাস্তাতেও এবং পলিসি টেবিলেও।
বীথি: দক্ষিণাঞ্চলের নারীরা… পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে এবং যেখানে নারীদেরকে দেখছি যে তাদের জরায়ু কেটে ফেলে দিতে হচ্ছে। তাদের পিরিয়ডজনিত সমস্যা হচ্ছে। আপনাদের এই সংস্কার প্রস্তাবনায় কীভাবে ইন্টারসেকশনালিটি এবং ক্লাইমেট জেন্ডার জাস্টিস ব্যাপারটাকে এড্রেস করেছেন। কীভাবে আপনারা সেই প্রস্তাবনাগুলো তৈরি করেছেন, আমি একটু জানতে চাই।
শিরীন: জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে একটা আলাদা সেকশনই আছে আমাদের। সেটা হচ্ছে সপ্তদশ অধ্যায়। সেখানে আমরা চেষ্টা করেছি প্রেক্ষাপটটা তুলে ধরতে যে ,জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে… লবণাক্ততা অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় এবং সেখানে যে নারী প্রজনন ক্ষমতা কীভাবে আক্রান্ত হচ্ছে, কীভাবে ব্যহত হচ্ছে, সেগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি এবং সেখানেও কিন্তু আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে কী কী করণীয় সেটাকে আলাদা করেছি। এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের মেয়াদে কী করণীয় সেটাকে আলাদা করেছি। আবার সেইসাথে আলাদা করেছি আমাদের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন। তো, সেখানে বেশ কয়েকটা সুপারিশ আমরা রেখেছি, প্রস্তাব আমরা রেখেছি।
বীথি: একটু যদি আমরা জানতে পারি, তাহলে খুব ভালো হয়। যদি আমাদেরকে বলেন এবং আমার ধারণা একটা দুইটা প্রস্তাবনা নিয়েই বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমার ধারণা, কেউই আসলে সবগুলো প্রস্তাবনা সেই অর্থে পড়েননি বা জানেনও না নারীদের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে।
শিরীন: না, একসময় তো মনে হয়েছিল যে কেউই পড়েনি কিন্তু হেফাজত পড়েছে। কিন্তু পরে মনে হলো হেফাজতও পড়েনি। হেফাজত ওই তিনটা জিনিসে আটকে গেছে। তিনটা বিষয়ে। এবং সেই সাথে সাথে অন্যরাও আটকে গেছে। আমাদের জন্য ডিস্যাপয়েন্টমেন্টের জায়গা, সেটা হলো যে, অনেক প্রগতিবাদী সংগঠন বা প্রগতিবাদী স্বর আমাদের পক্ষে একটা টু আওয়াজ করেনি। বিশেষ করে যখন আমরা হেফাজতদ্বারা আক্রান্ত হলাম তখন তারা কিন্তু জোর গলায় কিছুই বলেনি একমাত্র শ্রম কমিশন ছাড়া। শ্রম কমিশন আমাদের পক্ষে থেকেছে, পাশে থেকেছে। আমরাও তাদের পক্ষে থাকার চেষ্টা করেছি, পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো যে, আমরা যাদেরকে প্রগতিবাদী বলে চিনি, জানি এবং যারা মুখে ফেনা তুলে ফেলে গণতন্ত্র এবং সংস্কার নিয়ে বা সমাজের অগ্রগতি নিয়ে, তারা কিন্তু এই সময় চুপ ছিল।
বীথি: আপনারা তো রাষ্ট্রকে সাহায্য করছেন। সেই জায়গাটা থেকে যখন আপনাদের এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়, একদম বোধহয় ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে; এটা কি আপনাদের কাজকর্মে কোনো প্রভাব ফেলতে পেরেছে?
শিরীন: ততদিনেই তো আমরা জমা দিয়ে ফেলেছি। ততদিনেই কিন্তু এটা জমা হয়ে গেছে।
বীথি: আপনারা কমিশনের রিপোর্ট জমা দিলেও আমি জানি যে, আপনারা বিভিন্ন জায়গায় এখনো মিটিং করছেন। আপনাদের যে পেন্ডিং কাজগুলো আছে সেগুলো করছেন। নিশ্চয়ই আপনারা সংস্কার প্রস্তাবনার প্রতিবেদন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনাদের কাজ শেষ হয়ে যায় বা সংস্থার কমিশনের কাজ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সেগুলোর যে সহায়তাগুলো, সেগুলো আমি জানি আপনারা এখনো করছেন। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র আপনাদেরকে কতটা সহায়তা করছে?
শিরীন: আমরা যেটা করেছি, এই মুহূর্তে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে, কোথায় গেলে কাজ হবে। বিশেষ করে আমরা যেগুলোকে, তাৎক্ষণিকভাবে ডু-এবল মনে করছি, আমরা মনে করছি বাস্তবায়নযোগ্য, সেক্ষেত্রে আমরা এখন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাথে বসছি। আমরা বেশ কয়টা মন্ত্রণালয়ের সাথে বসেছি, আমরা প্রধান বিচারপতির সাথে বসেছি। ওইখানে আমাদের যে সুপারিশগুলো, আমরা মনে করি এখনই করা সম্ভব, ওগুলোকে তুলে ধরেছি এবং তুলে ধরে তাদেরকে অনুরোধ করেছি, তারা যেন এগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সক্রিয় হন।
তো, তার মধ্যে সবচেয়ে আমাদের বড় স্টেকহোল্ডার হচ্ছে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এবং আমরা তাদেরকে বিশেষভাবে আবেদন করেছি যে, তাদের ভূমিকা যেটা, আমরা যেখানে প্রস্তাব করেছি তাদের ভূমিকাকে আমরা বেশ মৌলিকভাবে পাল্টাবার কথা বলেছি। আমরা বলেছি যে, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাজ ছোট ছোট প্রকল্প বাস্তবায়ন না। তাদের কাজ হচ্ছে, নারীর বিষয়টাকে মূলধারায় নিয়ে আসা এবং এই বিষয়টাতে যে প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব আছে, সেটাকে বারবার করে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। সুতরাং, একটা ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করবে এই মন্ত্রণালয়। কিন্তু দুইটা বিষয়ে আমরা বলেছি, নারী মন্ত্রণালয়ে সাবজেক্ট হিসেবে থাকবে, একটা হচ্ছে নারীর ওপর সহিংসতা, আরেকটা হচ্ছে বাল্যবিবাহ। এই দুটোকে আমরা বলেছি যে, এই দুটো জিনিস এই মন্ত্রণালয়কেই নেতৃত্ব দিতে হবে। আর বাকিগুলো— কৃষি মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয়, নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মূল কাজ হবে যে, দেখা যে, এক্রস দ্য বোর্ড। এক্রস দ্যা বোর্ড, সরকার এই ইস্যুগুলোকে তুলে নিচ্ছে কি না, এবং এই ইস্যুগুলোকে নিয়ে আগাচ্ছে কি না। সেইটা হবে নারী মন্ত্রণালয়ের কাজ। এবং আমরা এটাও বলেছি যে, নারী মন্ত্রণালয়ের অধীনে এখন দুটো প্রতিষ্ঠান আছে। একটা হলো নারী বিষয়ক অধিদপ্তর। আরেকটা হলো জাতীয় মহিলা সংস্থা। আমরা জানি জাতীয় মহিলা সংস্থা মূলত একটা দলীয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণের জন্য একটা বিশেষভাবে তৈরি করা সংগঠন। কিন্তু আমরা বলেছি যে, এটা বিলুপ্ত করা যায়, এটার কোন প্রয়োজন নেই। বা এটার যে অ্যাসেটস আছে এবং ওখানে যারা প্রশিক্ষক আছেন ইত্যাদি, তাদেরকে অধিদপ্তরের সাথে মার্জ করে দিলে হয়। তো, এই ধরনের প্রস্তাবও আমরা রেখেছি যে, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কোথায় কোথায় কী কীভাবে পরিবর্তনগুলো আনা যেতে পারে।
বীথি: আমি শুধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কথা বলছি না। ইন জেনারেল। রাষ্ট্র কি কখনো আসলে নারীর ক্ষমতায়ন বা নারীর অধিকারের প্রশ্নে কখনো প্রকৃত মিত্র হতে পারে? বা অনুকূল একটা পরিবেশ তৈরি করতে পারে? মানে রাষ্ট্রকে আসলে এলাই হিসেবে কাউন্ট করা উচিত কি উচিত না, আপনি কি মনে করেন?
শিরীন: সেটা তো নির্ভর করে আমার রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। আমরা দেখেছি, আইসল্যান্ড একটা উদাহরণ, রোয়ান্ডা একটা উদাহরণ, ফিনল্যান্ড একটা উদাহরণ। ওইখানে ক্যাবিনেটেই নারীর আধিক্য আছে। এবং তারা কিন্তু নারীদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, নারীদের সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে, দুটি ক্ষেত্রেই অনেক সক্রিয়, অনেকভাবে সচেষ্ট এবং অনেক কিছু অর্জনও করতে পেরেছে। সুতরাং এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। রাজনৈতিক সদিচ্ছা যদি থাকে, রাষ্ট্র আমার মিত্র হতেই পারে এবং আমাকে চেষ্টা করতে হবে রাষ্ট্রকে আমার পক্ষে কাজ করাতে। কিন্তু যেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা একেবারেই নেই, সেখানে তো আমরা কিছুই আশা করতে পারি না।
বীথি: আমরা প্রতিবছর বাজেটে দেখতে পাই যে, নারীদের ব্যবহৃত পণ্য, তথা স্যানিটারি ন্যাপকিন বা এ ধরনের যেসব পণ্য রয়েছে সেগুলোর দাম বেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে আপনারা আপনাদের প্রস্তাবনায় কি এই ধরনের কোনো ব্যাপার বা এ ধরনের ইস্যুগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কি না— যেখানে আসলে অর্থমন্ত্রণালয় বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সেগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে?
শিরীন: আমরা এটা নিয়ে আলাপ করেছি যে, এটার উপর যে কর আরোপ করা হয়েছে, অন্তত এই করটা যেন উঠিয়ে নেওয়া হয়। সেটা বলেছি এবং আমরা আলাপ করেছি, এখানে এনেছি কি না আমার তো এখন আর মনে নেই। স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিকল্প যেগুলো আছে সেগুলো যেন এভেইলেবল করা হয় নারীদের জন্য।
বীথি: আমরা অনেক আগে দেখেছিলাম, কোনো একটা চরে, যেখানে নারীরা তাদের পিরিয়ডের সময় একটা কাপড়ে বালু পেঁচিয়ে কুটলি করে সেটা ব্যবহার করেন। আমরা যখন একদিকে উন্নয়নের গল্প বলছি, আমরা যখন শহুরে বাস্তবতায় বিভিন্ন ধরনের অধিকার নিয়ে কথা বলছি তখন সমান্তরালে আরেকটা বাস্তবতা হচ্ছে এই নারীরা, যারা একদম খুব মৌলিক একটা অনুসঙ্গ, একটা নারীপণ্য, যেটা তারা ব্যবহার করতে পারছে না বা ব্যবহার করার মতো সামর্থ্য নেই, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র এখানে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে? আপনাদের সংস্কার প্রস্তাবনাগুলো কতটা বাস্তবে আসবে সেটা আমি পরে আলাপ করবো, কিন্তু এটা একদম খুব মৌলিক। সেক্ষেত্রে এটা আসলে রাষ্ট্র কীভাবে সমাধান করতে পারে?
শিরীন: রাষ্ট্রের যে সমাজকল্যাণ বিভাগ আছে, মন্ত্রণালয় আছে, অধিদপ্তর আছে এবং বিশাল একটা নেটওয়ার্ক আছে, এটার মাধ্যমে কিন্তু রাষ্ট্র যদি চায় তাহলে সেটা করাই যায় যে, স্বল্পমূল্যে এগুলো সরবরাহ করা। এটা করতেই পারে, যদি সেরকম সদিচ্ছা থাকে। এবং নারীরাও কিন্তু দাবি করছে সেটা। নারী আন্দোলনও সেটা দাবি করছে যে, এটাকে এক নম্বর, করমুক্ত করা হোক, দুই নম্বর, বিকল্পগুলো বাজারে আসুক।
বীথি: আপনারা যারা অনেকদিন ধরে নারী অধিকার আন্দোলন করছেন এখন এই প্রজন্মের যারা নারী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। আপনার কি মনে হয় যে, কোথাও যোগাযোগের কোনো একটা ঘাটতি রয়েছে বা আপনাদের এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে নারী অধিকারের প্রশ্নে যে ভাষাগুলো রয়েছে সেগুলো কি আসলে আপনারা একজন আরেকজনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারেন?
শিরীন: যতটা হলে ভালো হতো ততটা হয়নি। আর এখানে দৃষ্টিভঙ্গিরও একটা ব্যাপার আছে। আমার দৃষ্টিভঙ্গিটাই যে সঠিক তাও কিন্তু আমি জানি না। কিন্তু ২০২০ সালে বেগমগঞ্জে যে ঘটনাটা ঘটলো, সেটা নিয়ে যখন তোলপাড় শুরু হলো, তখন বর্তমান প্রজন্মের কিছু নারী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলো এবং বলল যে, আমরা একসাথে কিছু করতে পারি কি না। আপনাদের যে অভিজ্ঞতা আছে সেটা কাজে লাগিয়ে আমাদের যে এনার্জি আছে এই দুটোর একটা সম্মিলন করে আমরা কিছু করতে পারি কি না? তখন আমরা কিন্তু সেই সময়, যখন কোভিড চলছে তখন আমরা বড় একটা প্রতিবাদ করতে পেরেছিলাম এবং সেই প্রতিবাদটা তখন করেছিলাম প্রজন্মান্তরের নারীবাদী মৈত্রী, যেটার ইংরেজি ছিল ফেমিনিস্ট এক্রস জেনারেশন। ফেমজেন। তো, সেটা করতে পেরে আমাদের খুব ভালো লেগেছিল। কারণ আমরা এই প্রজন্মের সাথে একটা সরাসরি কথোপকথনে আসতে পেরেছি। তাদের কাছে কোন ইস্যুগুলো বেশি প্রাধান্য পায়, আমাদের কাছে কোনগুলো বেশি প্রাধান্য পায়, এগুলো নিয়ে একটা মতবিনিময় করার সুযোগ হয়েছিল আমাদের। কিন্তু দুঃখজনক যেটা, সেটা হল ফেমজেন সেভাবে আমরা আর ধরে রাখতে পারলাম না। কারণ, আমরা মনে করেছিলাম এবার নেতৃত্ব দেওয়ার পালা এই প্রজন্মের। আমরা নেতৃত্ব দেবো না, ওরা নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু ওরা আর এটাকে সেভাবে ধরে রাখতে পারেনি। তো, সেখানে আমার একটা ইয়ে (বক্তব্য) হলো যে, যে জিনিসের জন্য আমরাই লড়াই করেছি যে, নারী নারীর জীবনকে স্বাধীনভাবে যেন পরিচালিত করতে পারে, সেজন্য নারীর শিক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নারীর পেশাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নারীর পেশাজীবী হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য সফল পেশাজীবী হতে গিয়ে নারীদের কিন্তু অনেক সময় দিতে হচ্ছে চাকরির ক্ষেত্রে বা ব্যবসার ক্ষেত্রে। যে যেটার সাথে যুক্ত। এবং সেজন্য কিন্তু অনেকে বলছে, আমাদের তো আন্দোলন করার সময় নেই। তো সেটা একটা আইরনি। কারণ, আমরাই চেয়েছি, মেয়েরা এগুলো সিরিয়াসলি নিক।
বীথি: কোনোধরনের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য কোনো ধরনের সভা সেমিনার, এই ধরনের কোনো কিছু কি আসলে আপনাদের পরিকল্পনায় রয়েছে কি না?
শিরীন: কোভিডকালীন কিন্তু আমরা প্রতি মাসে ওয়েবিনার করেছি, যেখানে সারা দেশের… আমাদের একটা নেটওয়ার্ক আছে দুর্বার নেটওয়ার্ক, সেখানে ৫৩০টা নারী সংগঠন সদস্য এবং তাদেরকে নিয়ে এবং অন্যদেরকে নিয়ে আমরা ওয়েবিনার করেছি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে। পুরো বছর সেই ওয়েবিনার আমরা করেছি। সেটা আমাদের কাছে মনে হয়েছিল যে, একটা গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, যেটা আমাদেরকে এই নতুন প্রজন্মের নারীদের সাথে যুক্ত করতে সাহায্য করে।
বীথি: নারীরা তো আসলে সমাজের, এই রাষ্ট্রের, এমনকি এই বিশ্বের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বা কিছু ক্ষেত্রে অর্ধেকেরও বেশি।
শিরীন: বাংলাদেশে অর্ধেকের বেশি।
বীথি: হ্যাঁ। সে ক্ষেত্রে নারী ইস্যুটা কীভাবে, নারী ইটসেল্ফ, কীভাবে বিতর্কিত ইস্যু হয়?
শিরীন: আমার মনে হয় যেটা বিতর্কিত হওয়ার মূল জায়গা, সেটা হলো নারীর কাছে নারীর শরীরের স্বাতন্ত্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই শরীর শব্দটাই একটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। মানে, আমরা যতক্ষণ সমান মজুরির কথা বলব তখনও কিন্তু গ্রহণযোগ্যতা থাকে। কিন্তু যখন আমি বলব শরীর আমার সিদ্ধান্ত আমার, তখনই মানুষ ভাবে— এটা আবার কী! এটার মানে কি? তখন নেতিবাচক একটা প্রতিক্রিয়া হয়। কিন্তু নারীর যে দাবিনামা, নারীর যে অধিকারগুলোর দাবিনামা, সেখানে কিন্তু নারীর শরীরের উপর নারীর নিজস্ব অধিকার, এটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা। সেজন্য আমার মনে হয়, শুধু নারী নিয়ে কথা বললে অতটা ইয়ে (প্রতিক্রিয়া) হয় না, কিন্তু যেহেতু নারী বললেই সাথে সাথে নারীর শরীরটা চলে আসে, তখনই কিন্তু সমস্যাটা হয়।
বীথি: পুরুষদের অনেকে আসলে প্রচণ্ডরকমের নারীবিদ্বেষী এবং নারীবিরোধী কিছু ক্ষেত্রে। নারীবিরোধী অবস্থানও অনেক সময় আমরা নিতে দেখি। আপনার কি কখনো মনে হয়েছে যে, এই আন্দোলনটা অনেক মানুষের সঙ্গে আপোষ করে এগিয়ে নিতে হয় এবং সেখানে নৈতিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করে কাজ করতে হয়।
শিরীন: এক সময় আমাদেরকে খুব সমালোচনা করা হতো, কারণ আমরা আমাদের মিছিলে, বিশেষত প্রতিবাদ মিছিলগুলোতে বলতাম যে, না, আমাদের আন্দোলনের চেহারাটা হবে নারীর। আন্দোলনের চেহারাটা পুরুষের হবে না। আন্দোলনে নেতৃত্বের চেহারাটা হবে নারীর। এবং এটা নিয়ে কিন্তু আমরা খুব ঝামেলায়ও পড়েছিলাম একসময়। কারণ, প্রথম, এটা বোধহয় ১৯৮৫ সাল, নারীপক্ষ তখন মাত্র দুই বছর হয়েছে। তখন আমরা বড় নারী সংগঠরগুলোর সাথে মিলে একটা প্রতিবাদ শুরু করেছিলাম। শব মেহের নামের দশ বছরের একটি মেয়ে, টানবাজার যৌনপল্লী থেকে কোনোরকমে পালিয়ে এসে নারায়ণগঞ্জ রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে পড়ে ছিল। তখন এক ভদ্রলোক ওকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেয়। কিন্তু মেয়েটি বাঁচলো না। তখন [১৯]৮৫ সাল, মনে রাখতে হবে, এটা হলো এরশাদ আমল। এবং এরশাদ আমলে সেই বছরে গণমাধ্যমের উপরে নানা রকমের সীমাবদ্ধতা, নানা রকমের রেস্ট্রিকশনস আরোপ করা হয়েছে। তখন হঠাৎ করে সামনের পাতায় আসতে শুরু করল এইসব ঘটনা। কারণ, এগুলো সরাসরি রাজনৈতিক বিষয় না। নারীর উপর কত রকমের অত্যাচার হচ্ছে, কী হচ্ছে না হচ্ছে, অনেক বেশি রিপোর্ট আসতে শুরু করলো। তখন মেহেরের ঘটনাটা একদম সামনের পাতায় আসলো। এবং সেটার প্রতিক্রিয়াটা ছিল, আহারে, এভাবে একটা ছোট মেয়ে, একটা নিষ্পাপ… কথাটা ছিল নিষ্পাপ মেয়ে, তার উপরে অত্যাচারটা হলো, সে অত্যাচার থেকে সে কোনোরকম পালিয়ে এসেছিল কিন্তু বাঁচতে পারলো না।
তখন আমরা সবাই মিলে একটা প্রতিবাদ সভা করার কথা ভাবলাম, কিন্তু দেখা গেলো যে, আমাদের বৃহত্তর নারী সংগঠন, তারা বলছে যে, এখানে বক্তা হবে অমুক গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা পুরুষ মানুষ, উপাচার্য, বড় নেতা ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা বললাম, কেন? আন্দোলনটা তো নারীদের। উনারা থাকতে পারেন, উনারা আমাদের পাশে থাকতে পারেন, আমাদের পিছনে থাকতে পারেন। আমাদের সামনে না। এই জিনিসটা নিয়ে খুব তর্ক হয়ে গেল। সেখানেই বুঝলাম যে, আমরা একমত হতে পারছি না। নারী আন্দোলন অনেকভাবে বিভক্ত, এটাও একটা ব্যাপার ছিল যে, আন্দোলনের স্বরটা কার হবে, নারীর না পুরুষের? কারণ, পুরুষ আমাদেরকে রক্ষা করবে, পুরুষ আমাদেরকে সুরক্ষা দিবে, পুরুষ আমাদেরকে মা-বোন ডাকবে, কিন্তু সমনাগরিকের মর্যাদা কখনো দেবে না। তো, সেইসব নিয়ে আমাদের মধ্যে পরিষ্কার একটা ভাগাভাগি হয়ে গেল। আমি মনে করি, সেটা কিন্তু… আমি ওটাকে নেতিবাচক মনে করি না। আমি মনে করি এটা অগ্রগতির একটা অংশ।
বীথি: এখনকার প্রজন্মের নারীরা যখন কোনো আন্দোলন করেন, তাদের আন্দোলনে অনেক ধরনের বৈচিত্র্যময় একটা পরিবেশ আমরা দেখতে পাই। যেমন আমি যদি বলি, ধর্ষণবিরোধী একটা আন্দোলন তাদের ছিলো, যেখানে শাহবাগে দাঁড়িয়ে নাচছিল নারীরা এবং বলছিল তুই পুরুষ, তুই ধর্ষক, এই ধরনের বিভিন্ন ধরনের স্লোগান ছিল বা দেখা যাচ্ছে যে তারা…
শিরীন: ওইটাই ফেমজেন, ওইটার কথাই আমি বলছিলাম, ওইটা ফেমজেনের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল। আমরাও ছিলাম।
বীথি: তারপরে আবার দেখা যাচ্ছে যে, তারা যখন পোশাক নিয়ে কথা বলে, পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলে, তারা বিভিন্ন ধরনের পোশাক পরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যায়, গান করে, নাটক করে। আপনার কি মনে হয় যে, এই যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, আন্দোলনের ভাষাটা পাল্টাচ্ছে, ধরন পাল্টাচ্ছে, এটা কি আসলে পজিটিভ নাকি নেগেটিভ? আপনি কীভাবে দেখেন?
শিরীন: আমি মনে করি খুবই ইতিবাচক। আমরা ছিলাম ওদের সাথে। এবং আমরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ফ্ল্যাশ মব করেছি। এটা সেই বছরেই শুরু হয়েছিল, বোধহয় চিলিতে। দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্র চিলিতে। এবং সেই জায়গা থেকে এটা খুব ছড়িয়ে যায়। সারা পৃথিবীতে নারী আন্দোলন ওই একই সুরে একই কথা নিয়ে ফ্ল্যাশ মব করা; সেটা আমরাও করলাম তখন। এবং আমরা করলাম ওরা থাকাতে। ওরা ছিল বলে আমরা করতে পারলাম। মানে, এই প্রজন্মের নারীরা পদক্ষেপটা নেওয়াতে আমরা ওর সাথে যুক্ত হতে পেরেছি এবং আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে, তারা এটা করেছে।
বীথি: অনেকে বলে থাকেন যে, নারীপক্ষের যে রাজনীতি বা নারীপক্ষের যে লৈঙ্গিক রাজনীতি, জেন্ডার পলিটিক্স, সেটা অনেকটা কনজারভেটিভ, অনেক ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে। আপনি কি মনে করেন, আসলেই কোনো সীমাবদ্ধতা আছে নাকি?
শিরীন: সীমাবদ্ধতা নিশ্চয়ই আছে, নিশ্চয় আছে। কিন্তু অনেক আছে কি না, আমি মনে করি না। আমি মনে করি নারীপক্ষ অনেক ক্ষেত্রেই কাটিং এজে আছে। মানে অনেক ইস্যু নারীপক্ষ জনপরিসরে নিয়ে এসেছে, যেটা আগে কেউ আনেনি বা আনতে পারেনি। সীমাবদ্ধতা নিশ্চয় আছে, কিন্তু রক্ষণশীলতা আছে এটা আমি এগ্রি করবো না।
বীথি: এখন যখন নারীরা একদম সরাসরি সব কথা বলে, যে ভাষা ব্যবহার করেন সেটা নিয়ে অনেক নারীবাদীর আপত্তি দেখি এবং অনেকাংশে তারা এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ করতে চান নারীবাদী আন্দোলনটাকে। বা নারীবাদী আন্দোলন যে গ্রহণ এবং বর্জনের মধ্যে দিয়ে আরো বেশি সংস্কার করে নারীদের কথা বলতে পারে এটা তারা বিশ্বাস করেন না। আপনার বিশ্বাসটা আসলে কি?
শিরীন: আমি মনে করি যে, যতটা বৈচিত্র্য আমরা ধারণ করতে পারি তত ভালো। এবং সেটা যেকোনো আন্দোলনের ক্ষেত্রে। শুধু নারী আন্দোলনের ক্ষেত্রে নয়, যেকোনো আন্দোলনের ক্ষেত্রে আমি মনে করি, যতটা বৈচিত্র্য ধারণ করা যায় ততটাই পজিটিভ। এবং আমি মনে করি যে, নারীপক্ষ সেটা চেষ্টা করে, সেই বৈচিত্র্যটাকে ধারণ করার চেষ্টা করে।
বীথি: দুটো নারীকে যদি দুইটা সাইকেল দেওয়া যায়, সেটা হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। কিন্তু আসলে একটা সাংস্কৃতিক পরিবর্তন দরকার, সমাজে নারীরা, এটা তারা মনে করেন না। আপনার কি মনে হয় যে, বাংলাদেশে নারী আন্দোলন আসলে কখনো আন্দোলন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে? নাকি এটা আসলে সেই এনজিও পর্যন্ত উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে?
শিরীন: দুইটাই। আমি মনে করি দুইটাই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীদের নিয়ে আলাদা কর্মসূচি, সেটা প্রগতিবাদী কর্মসূচি হোক বা না হোক বা বিভিন্ন কর্মসূচি বিভিন্ন… এই যে উন্নয়ন সংস্থাগুলো আছে, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো, তারা করেছে। এবং তারা কিন্তু তৃণমূলে গিয়ে কাজ করেছে। সেটাকে অস্বীকার করা যাবে না। এবং তারা এই কাজটা করেছে বলেই অনেক নারী বেরিয়ে আসতে পেরেছে। যেটা আগে হয়তো পারেনি। সেই সুযোগগুলো ছিল না। সেই সুযোগগুলো কিন্তু অনেক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা তৈরি করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে এই ক্রেডিটটা দেবো। তারা এটা করেছে। কিন্তু তার মানে এই না যে, তারা সবসময় নারীর সমান অধিকারকে মাথায় রেখেছে বা নারীর স্বাতন্ত্র্য এবং স্বাধীনতাকে মাথায় রেখেছে। এবং নারী আন্দোলনের অনেক সংগঠন কিন্তু নারী স্বাধীনতার কথা বলে না বা নারীমুক্তির কথা বলে না। নারীর কিছু কিছু অধিকার নিয়ে কথা বলে, কিছু কিছু অগ্রগতি নিয়ে কথা বলে।
আর ক্ষমতায়ন শব্দটা হচ্ছে, আমার মতে সবচেয়ে মিসড ইউজ একটা শব্দ। ক্ষমতায়ন এখন এমন একটা শব্দ হয়ে গেছে যে, চাকরিতে বেতন বাড়লো, তা আমার ক্ষমতায়ন হয়ে গেল। ক্ষমতায়ন শব্দটারও অনেক… আমি যে জন্য এটা ব্যবহার করি না সহজে। কারণ এই শব্দটা যত্রতত্র ব্যবহার করে এটার মূল বিষয়টা যে একটা রূপান্তর ঘটতে হবে, সমাজের এবং নারী পুরুষের সম্পর্কে একটা রূপান্তর ঘটতে হবে, তার মধ্য দিয়ে নারীর ক্ষমতায়ন হবে, সেই জায়গা থেকে সরে এসে এখন হয়ে গেছে নারীর জন্য এই কর্মসূচিটা করলাম, নারীর জন্য এই সম্পদটা জোগাড় করে দিলাম, এটাই ক্ষমতায়ন। তো, সেই জায়গায় আমি ক্ষমতায়ন শব্দটা ব্যবহারের পক্ষেই না এখন।
বীথি: আমি এই ধরনের প্রশ্ন শুনেছি যে, আপনাদের অনেক সুপারিশ শহুরে মধ্যবিত্ত নারীদের জন্য, যেখানে ট্রান্সজেন্ডার নারী, আদিবাসী নারী বা যারা আসলে নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে এসে এই শহরে কোনো একটা গার্মেন্টসে কাজ করেন, গার্মেন্টস কর্মী, তাদের কথা আসলে ততটা বলে না। আপনি এই সমালোচনা টাকে কীভাবে নেবেন?
শিরীন: এই সমালোচনাটা এভাবে নেব যে, তারা পড়েনি। তারা পুরো জিনিসটা পড়েনি। কারণ, আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের ১০ জনের মধ্যে বিভিন্ন সেক্টরের নারীদেরকে নিয়ে কমিশন গঠন করতে। কমিশন গঠনের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা ছিল না। আমাকে পুরু স্বাধীনতা দেওয়া হয়ে হয়েছিলো যে, আপনি যাদেরকে নিয়ে কমিশন গঠন করতে চান…।
তো, আমি চেষ্টা করেছি ট্রেড ইউনিয়ন মুভমেন্ট থেকে মানুষকে রাখতে, অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে যারা কাজ করে, তাদেরকে রাখতে, আমি চেষ্টা করেছি গবেষণা যারা করে তাদেরকে রাখতে, আমি চেষ্টা করেছি যারা স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে, বিশেষজ্ঞ, নারী স্বাস্থ্য নিয়ে (কাজ করে), তাদেরকে রাখতে। এবং আমাদের এই একটাই কমিশন, যেটা নাকি ঢাকার বাইরে থেকে কোনো সদস্যকে রেখেছে এবং আমাদের সাথে নিরূপা দেওয়ান ছিল।
এবং এখন যেটা হচ্ছে, যেহেতু অন্য কোনো কমিশন ঢাকার বাইরে থেকে কাউকে রাখেনি, লজিস্টিক একটা সমস্যা হয়ে গেছে, উনি যে রাঙ্গামাটি থেকে আসা-যাওয়া করতেন, সে বিলগুলো এখন পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না, কারণ, এটা তো ফরম্যাটের মধ্যে নাই যে, আমরা ঢাকার বাইরে থেকে কাউকে নিয়ে আসবো। এবং আমরা কিন্তু আমাদের পরামর্শ সভাগুলো সব ঢাকায় করিনি। আমরা নিজেরা বসেছি, কমিশন বসেছে ৩৯ বার। কিন্তু আমরা ঢাকার বাইরে গিয়ে গিয়ে বিভিন্ন সেক্টরের সাথে বসেছি। যেমন, চট্টগ্রাম এবং খুলনায় আমরা শ্রমিকদের সাথে বসেছি। আবার উত্তরবঙ্গে আদিবাসীদের সাথে বসেছি। রাঙ্গামাটিতে আদিবাসীদের সাথে বসেছি। সুতরাং আমরা বিভিন্ন জনের… শুধু একটা ইস্যুতে আমরা আসিনি, যেটার সঠিক সমালোচনা, সেটা হলো ট্রান্সজেন্ডার ইস্যু। কারণ, সেটা আমাদের ম্যান্ডেটই ছিল না।
আমাদের ম্যান্ডেট হচ্ছে নারী। এবং সেখানে সব ধরনের নারী। সে ট্রান্স নারী হোক, কি ট্রান্স নারী না হোক, যেকোনো নারী হোক, সব শ্রেণীর, সব ধর্মের, সব বর্ণের এবং সব রকমের ভাষাগত… মানে এই সকল রকম বৈচিত্র্য আমরা কাভার করবো। কিন্তু আমরা আলাদা করে…
বীথি: আলাদা করে এড্রেস করে যে এই প্রস্তাবনাগুলো করা উচিত ছিল, সেগুলো আপনারা করেননি। সেক্ষেত্রে ট্রান্স নারীদের সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান হবে বা আপনারা কি এটা সংস্কার করার কোনো চিন্তা-ভাবনা আপনাদের রয়েছে কি না?
শিরীন: না। সেটা আমাদের ইয়ের (ম্যান্ডেটের) মধ্যেই নেই। সেটার জন্য যদি আরেকটা কমিশন হতো, ভালো হতো।
বীথি: নাদিরা ইয়াসমিন নামে একজন শিক্ষক, তাকে যে সীমাহীন লাঞ্ছনা এবং স্বয়ং রাষ্ট্র তাকে বদলি করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়,
শিরীন: সাতক্ষীরায় পাঠিয়ে দিল…
বীথি: হ্যাঁ, একদম, অনিরাপদ একটা অবস্থার ভেতর ফেলে দিল। এটা কি আসলে কিছুটা অপমানজনক কি না? একই সঙ্গে রাষ্ট্র বলছে যে, নারীদের এই এই অধিকারগুলো যেন প্রতিষ্ঠিত হয় বা কোন কোন অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত হবে তার জন্য একটা সংস্কার কমিশন করে দিল এবং একদিকে আরেকজন নারীকে একদম মবের হাতে তুলে দেওয়া হলো। এটা কি কিছুটা অপমানজনক কি না?
শিরীন: নিশ্চয়, নিশ্চয়। অপমানজনক শুধু না, আমরা মনে করি যে, এই জিনিসটা আমাদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। মানে, আমাদের একটা স্লোগানই তো হয়ে গেল— চেয়েছিলাম হিস্যা, হয়ে গেলাম বেশ্যা। যেহেতু আমি বেশ্যা শব্দটাকে অপমানজনক মনে করি না, সেজন্য ওটা আমি মনে করি না যে বেশ্যা শব্দটা অপমানজনক। তবে আমরা ১৯৯৯ সালে যখন যৌনকর্মীদের জন্য আন্দোলন করলাম, তাদের সাথে নিয়ে, তখন একটা আমাদের অর্জন হয়েছিল যে, গণমাধ্যমে পতিতা শব্দটার বিলুপ্তি ঘটেছিল। যৌনকর্মী শব্দটাকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলাম। এবং পরশুদিনও (অনুষ্ঠানটি রেকর্ডিংয়ের দু’দিন পূর্বে) আমাদের একটা আলোচনা সভা ছিল, যৌনকর্মীদের নিয়ে, যৌনকর্মীদের অধিকার নিয়ে। আপনারা জানেন যে, সেটা ওয়ান অফ দ্যা থ্রি, যেটা নিয়ে হেফাজত খুব ক্ষিপ্ত যে, যৌনকর্মকে আমরা স্বীকৃতি দিয়ে, স্বাভাবিককরণ এবং এনকারেজ করছি। সেটা বলেছে। তিনটা বিষয়ে ওদের মূল আপত্তির জায়গা ছিল, সেটা একটা। আরেকটা ছিল ম্যারিট্যাল রেপ, দাম্পত্য জীবনে ধর্ষণ, যেটা নাকি অহরহ হচ্ছে, যেটা নিয়ে মানুষকে হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে হচ্ছে, যে ক্ষতটা হচ্ছে, সেটা একটা। আরেকটা ছিলো পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে সমান অধিকার, সমান হিস্যা, যেটার জন্য নাদিরাকে এই লাঞ্ছনার শিকার হতে হলো।
এই এই দাবিটা কিন্তু বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ অনেককাল ধরে করে আসছে, তারা একটা অভিন্ন পারিবারিক আইনের কথা বলেছে, যেটা নাকি সমতাভিত্তিক হবে এবং যেখানে সব ধর্মের নারীদের একই রকম অধিকার, একই সেরকম হিস্যা থাকবে। কিন্তু সেটা আমরা যখন এখানে লিপিবদ্ধ করলাম, সেই সুপারিশটা, তখন আমাদেরকে বলা হলো যে, আমরা ধর্মকে অবমাননা করছি। আমরা কিন্তু খুব পরিষ্কারভাবে, ওখানে লেখা আছে, এটা আমরা বলছি যে, আমরা একটা সিভিল অপশন তৈরি করতে চাই। যারা ধর্মীয় পারিবারিক আইনে ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইনের অধীনে থাকতে চায়, থাকবে। তারা এবং অনেক নারীরা চায়, সুতরাং তাদের থাকার ব্যাপারে আমাদের কোনো বিরোধিতা নেই। আমরা বলেছি যারা থাকতে চাই না আমরা, তাদের জন্য একটা সিভিল অপশন তৈরি হোক। একটা ঐচ্ছিক। যে জন্য আমরা শব্দটা ব্যবহার করেছি যে, এটা ঐচ্ছিক হবে। এটা আমি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এটা মানতে বাধ্য হবো, তা যেন না হয়। যারা সমান অধিকারভিত্তিক একটা পারিবারিক আইন চায়, তাদের জন্যও তো জায়গা দরকার।
বীথি: আপনার কি মনে হয়, এই প্রস্তাবনাগুলো মেনে যে সরকারই আসবে, তারা যদি কাজ করেন, তাহলে বাংলাদেশের সংবিধানে বা বাংলাদেশের একদম তৃণমূল থেকে শহুরে সংস্কৃতিতে পর্যন্ত জেন্ডার সমতার যে ঘাটতিটা দেখি, সেটা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হবে?
শিরীন: সেটা নির্ভর করবে কতটা সদিচ্ছা থাকে সরকারের এই ব্যাপারে এবং তারা এগুলো কতটা বাস্তবায়ন করতে আগ্রহী হবে এবং সচেষ্ট হবে তার উপর নির্ভর করে আসলে।
বীথি: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
শিরীন: তোমাকেও ধন্যবাদ।●